লামিয়া মোর্শেদ, ড. নিয়াজ আহমেদ খান ও সেলিম উদ্দিনকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু করা প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে বর্তমান সরকার। সদ্য সাবেক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও এসডিজি-বিষয়ক সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোর্শেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সদ্য সাবেক উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমেদ খান এবং সাবেক সচিব সেলিম উদ্দিনকে আর রাষ্ট্রদূত করা হচ্ছে না। পাঁচ দেশ থেকে রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে চলতি মাসের প্রথম ভাগে আয়োজিত বৈঠকে লামিয়া, নিয়াজ ও সেলিমের বিষয়েও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা তাদের পক্ষে যায়নি। এর মধ্য দিয়ে আপাতত আর রাষ্ট্রদূত হওয়া হচ্ছে না লামিয়া মোর্শেদ, ড. নিয়াজ আহমেদ ও সেলিম উদ্দিনের।
পররাষ্ট্র ক্যাডারের পেশাদার ও অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রাজনৈতিক রাষ্ট্রদূত নিয়োগে আগ্রহী ছিল সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। পছন্দের অঞ্চল ইউরোপ হিসেবে লামিয়া মোর্শেদের আগ্রহ ছিল নেদারল্যান্ডস। লামিয়াকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে দেশটির সরকারের কাছে ‘এগ্রিমো’ তথা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে। গত বছরের নভেম্বরে বিষয়টি জানাজানি হলে এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তবে এমন দাবি তখন প্রত্যাখ্যান করেছিল গত সরকার।
অবশ্য সূত্র বলছে, লামিয়াকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগে নেদারল্যান্ডস সরকারের কাছে দেওয়া এগ্রিমোর জবাব শেষ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। নিজেদের মেয়াদের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত এগ্রিমোর জন্য অপেক্ষা করেছে ইউনূস প্রশাসন। নেদারল্যান্ডস থেকে এগ্রিমো এলেই রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেওয়া হতো লামিয়াকে। অবশ্য বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নতুন সরকারের আমলে দায়িত্ব নিয়ে নেদারল্যান্ডসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফাইয়াজ মুর্শিদ কাজীকে। ইতোমধ্যে নেদারল্যান্ডস সরকারের কাছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো এগ্রিমোর ইতিবাচক জবাব পেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আগামী মে-জুনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচনের পরে হেগে যোগ দেবেন ফাইয়াজ। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিল।
লামিয়া মোর্শেদের পাশাপাশি ডেনমার্কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে রাজনৈতিক বিবেচনায় ঢাবির সদ্য সাবেক ভিসি ড. নিয়াজের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে লামিয়ার সঙ্গে নিয়াজের বিষয়টিও ফাঁস হলে ডেনমার্কে আর নিয়োগ পাননি তিনি। এরপর ইরানে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ হিসেবে এগ্রিমো চেয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। ইরানও ড. নিয়াজকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে গ্রহণ করে সম্মতি প্রদান করে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে অর্থাৎ, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে ইরান সরকারের ‘সবুজ সংকেত’ পায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইরানে রাষ্ট্রদূত হতে আগ্রহী ছিলেন না ঢাবি উপাচার্য। তাই এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রদূত হওয়া হয়নি তার। শোনা যাচ্ছে, ব্যক্তিগত ব্যবস্থাপনায় ডেনমার্কে যাচ্ছেন ড. নিয়াজ।
তবে চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না ঢাবি উপাচার্যের মধ্যে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দফায় দফায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ধরনা দিয়েছেন তিনি। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিদায়ের প্রাক্কালে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ড. নিয়াজ। গত ৫ জানুয়ারি বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার গুলশান কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেছিলেন তিনি। সূত্র বলছে, দলটির ‘সুনজরে’ আসতে এবং রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার নিয়োগের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতেই সেদিন গুলশান গিয়েছিলেন তিনি।
অন্যদিকে সাবেক সচিব সেলিম উদ্দিনকে মিশরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করতে দেশটির সরকারের কাছে এগ্রিমো চেয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। আওয়ামী লীগ আমলে অন্যতম সুবিধাভোগী আমলা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাণিজ্যসচিব হিসেবে অবসরে যাওয়া সেলিমের নিয়োগ প্রায় চূড়ান্ত ছিল; অপেক্ষা ছিল শুধু কায়রোর সবুজ সংকেতের। তবে গত বছরের অক্টোবরে এগ্রিমো চাওয়া হলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি মিশর। বাংলাদেশও এতদিন এগ্রিমোর আবেদন প্রত্যাহার করেনি।
তবে চলতি মাসের শুরুতে চার দেশ থেকে রাজনৈতিক বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত এবং পররাষ্ট্র ক্যাডারের একজন পেশাদার কূটনীতিক হাইকমিশনারকে প্রত্যাহার করে বর্তমান সরকার। তাদের ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত গ্রহণকালীন সভায় সিদ্ধান্ত হয় লামিয়া মোর্শেদ, ড. নিয়াজ আহমেদ এবং সেলিম উদ্দিনের বিষয়েও। ওই সভার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র পরিচয় গোপনের শর্তে জানিয়েছেন, এই তিন ব্যক্তির রাষ্ট্রদূত নিয়োগের প্রক্রিয়া স্থগিত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ লামিয়া, নিয়াজ ও সেলিমকে আর রাষ্ট্রদূত করছে না বর্তমান সরকার। বিষয়টি একপ্রকার নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। কোনো ব্যক্তির নাম না নিলেও হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আগের সরকারের সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগের মতো বিষয় বিবেচনা করার কোনো পরিকল্পনা এই মুহূর্তে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের নেই।’





