ধর্মান্ধতা বনাম সত্য ভাবনা

পবিত্র কোরআন এবং ইসলামের মূল দর্শনে অন্ধ অনুকরণের চেয়ে মানুষের বিবেক, যুক্তি ও স্বাধীন চিন্তাশক্তি ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্রষ্টা মানুষকে যে অনন্য বুদ্ধিমত্তা দিয়েছেন, তা খাটানো প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনের সূরা আনফালের ২২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে, “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম জীব সেই বধির ও মূকেরা, যারা চিন্তা বা বুদ্ধিপ্রয়োগ করে না।“
এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, সত্যকে জানার ও বোঝার ক্ষমতা থাকার পরও যারা নিজেদের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করে না, তারা স্রষ্টার দৃষ্টিতে অধম। এছাড়া পবিত্র কোরআনের অসংখ্য স্থানে মানুষকে মহাবিশ্ব, প্রকৃতি এবং নিজের অস্তিত্ব নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা ও গবেষণা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। যেমন পবিত্র কোরআনের সূরা আল-ইমরানের ১৯১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে, “যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করে, তারা বুঝতে পারে যে এই সৃষ্টি নিরর্থক নয়।“
পবিত্র কোরআনে বারবার সতর্ক করা হয়েছে যেন মানুষ কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া কেবল পূর্বপুরুষদের প্রথা বা সমাজের অন্ধ অনুকরণ না করে। কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়া বাপ-দাদার রীতিনীতি আঁকড়ে ধরে রাখাকে কোরআনে গোঁড়ামি ও বিচ্যুতির লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে সূরা বাকারার ১৭০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে,
“আর যখন তাদেরকে বলা হয়, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার অনুসরণ করো, তারা বলে, ‘না, বরং আমরা আমাদের পিতৃ পুরুষদেরকে যার ওপর পেয়েছি তারই অনুসরণ করব।’ যদিও তাদের পিতৃপুরুষরা কিছুই বুঝত না এবং হেদায়াতপ্রাপ্তও ছিল না, তবুও কি তারা তাদের অনুসরণ করবে?”
সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, সাধারণ মানুষ নিজে মূল ধর্মগ্রন্থ বা উৎসগুলো পাঠ ও অনুধাবন না করে বিভিন্ন প্রচলিত প্রথা বা কিছু মানুষের মনগড়া ব্যাখ্যার ওপর চোখ বন্ধ করে নির্ভর করে। এর ফলে প্রকৃত ধর্মীয় উদারতার চেয়ে মানুষের তৈরি কঠিন নিয়ম ও ধর্মীয় কঠোরতা সমাজে বেশি প্রাধান্য পায়। যেকোনো ফতোয়া, তাফসির বা সামাজিক ব্যাখ্যা সঠিক হওয়ার প্রধান শর্ত হলো সেটি যেন মূল গ্রন্থ কোরআনের কোনো স্পষ্ট ও সার্বজনীন বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। মূল গ্রন্থই হলো সব বিষয়ের চূড়ান্ত মানদণ্ড। কিন্তু অন্ধ অনুকরণ প্রিয়তার কারণে মানুষ অনেক সময় মূল দর্শনের চেয়ে মানুষের তৈরি দুর্বল বা বিতর্কিত ব্যাখ্যাকে বেশি আঁকড়ে ধরে, যা সমাজে বিভেদ, উপদলীয় কোন্দল এবং উগ্রতা তৈরি করে।পবিত্র কোরআনের সূরা তাওবার ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এমন অন্ধ ভক্তির সমালোচনা করেছেন।
আধুনিক সমাজে ধর্মীয় বা নৈতিক আচরণের একটি বড় অংশ বাহ্যিক লেবাস, আনুষ্ঠানিকতা ও প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অনেকে নির্দিষ্ট পোশাক বা অবয়বকেই ধার্মিকতার চূড়ান্ত মাপকাঠি বানিয়ে ফেলেন। কিন্তু আধ্যাত্মিক দর্শন অনুযায়ী, বাহ্যিক রূপ বা পোশাক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে, তবে তা কখনো অন্তরের সততা ও নৈতিক চরিত্রের বিকল্প নয়। পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ১৭৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে,
“পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ ফেরানোর মধ্যে কোনো পুণ্য নেই; বরং পুণ্যবান তো সেই যে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, সমস্ত কিতাব এবং নবীগণের ওপর ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর ভালোবাসায় আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, মুসাফির ও সাহায্যপ্রার্থীদের অর্থ দান করে।“
প্রকৃতপক্ষে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে মানুষের ভেতরের মানবতাবোধ, দয়া, ইনসাফ এবং নৈতিক আচরণই আসল ধর্ম।
যেকোনো পবিত্র গ্রন্থ বা দর্শন কেবল সুর করে পাঠ করা বা অর্থ না বুঝে মুখস্থ করার জন্য আসেনি। প্রাচীনকালে তথ্য সংরক্ষণের প্রযুক্তি না থাকায় গ্রন্থ সম্পূর্ণ মুখস্থ রাখার একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রয়োজনীয়তা ছিল। কিন্তু বর্তমান যুগে শুধু না বুঝে মুখস্থ করার চেয়ে গ্রন্থের ঐশ্বরিক বিধান, মর্মার্থ ও মূল দর্শন বোঝা এবং তা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে প্রয়োগ করা অনেক বেশি জরুরি। জ্ঞান আহরণের সময় নিজের মনের ভেতরের পূর্বপরিকল্পিত কোনো অন্ধ ধারণা বা পক্ষপাতিত্ব দূর করে উম্মুক্ত মন নিয়ে সত্য অনুসন্ধান করতে হয়।পবিত্র কোরআনের সূরা মুহাম্মাদের ২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে,
“তবে কি তারা পবিত্র কোরআন নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করে না, নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা লেগে রয়েছে?”
ধর্মের নামে গড়ে ওঠা অন্ধত্ব, সংকীর্ণতা ও উগ্রতা থেকে মুক্ত হতে হলে প্রতিটি মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অভ্যাস গড়তে হবে। কোনো ব্যক্তির মতবাদের ওপর অন্ধভাবে নির্ভরশীল না হয়ে, সরাসরি মূল উৎসগুলো অধ্যয়ন করা, তা নিয়ে গভীর গবেষণা করা এবং আল্লাহ প্রদত্ত বিবেক খাটানো অপরিহার্য। যখন মানুষ অন্ধ অনুকরণ ছেড়ে জ্ঞান ও যুক্তির আলোয় সত্যকে বুঝবে, তখনই সমাজ থেকে গোঁড়ামি দূর হবে এবং ধর্মের প্রকৃত শান্তি, উদারতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হবে।
বলাই বাহুল্য, সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের বক্তব্যের গভীর তাৎপর্য অনুধাবন না করে বাস্তব বিবর্জিত সমালোচনা নিঃসন্দেহে সত্য ভাবনার পরিপন্থী।
লেখক – সৈয়দ ইফতেখার আলী, সাবেক সভাপতি, সাতক্ষীরা জেলা বিএনপি।
##