বিরোধী দলে নির্যাতিত হলেও সরকারে এখনো অবহেলিত তারা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় এখন পর্যন্ত ঠাঁই হয়নি দলের দীর্ঘদিনের একাধিক ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতার। এ তালিকায় রয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নুল আবদিন ফারুক, অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল এবং কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণের মতো নেতারা।
বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের ত্যাগ, নির্যাতন ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার জন্য পরিচিত তারা। নেতাকর্মীদের মতে, পরীক্ষিত নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে দীর্ঘমেয়াদে তা দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে রাজপথে আপসহীন ভূমিকা রাখা অনেকেরই ঠাঁই হয়নি মন্ত্রিসভায়। রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সোচ্চার ছিলেন অনেকে।
রাজপথে লড়াই করা ও বছরের পর বছর জেল-জুলুম সহ্য করা এই নেতাদের বাদ পড়া নিয়ে দলের তৃণমূলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেকের মন্তব্য, বিরোধী দলে থাকাকালে যারা সরকারের নির্যাতন সহ্য দল টিকিয়ে রেখেছেন, ক্ষমতায় আসার পর পদ-পদবি ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা অবহেলিত থেকে গেছেন।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়:
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই জ্যেষ্ঠ সদস্য বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আমলে রাজপথের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন। বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পুলিশের বারবার হামলা ও টিয়ারশেলের মুখেও পিছু হটেননি। ২০২৩ সালে পুরান ঢাকার ধোলাইখালে দলীয় অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশের হামলায় রক্তাক্ত হন তিন

২০২৩ সালে পুরান ঢাকার ধোলাইখালে দলীয় অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশের হামলায় রক্তাক্ত গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। ছবি: সংগৃহীত
রাজনীতিতে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের অভিষেক ষাটের দশকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে প্রথম রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭৮ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে বিএনপির সঙ্গে তার পথচলা শুরু।
১৯৮৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত যুবদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। পরে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক হন। ২০০২ সালে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয়নি।
রুহুল কবির রিজভী:
বিএনপির সবচেয়ে বড় সংকটের দিনগুলোতে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল রুহুল কবির রিজভীর দ্বিতীয় বাড়ি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, মামলা ও কারাভোগের তোয়াক্কা না করে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী সরকারের অপশাসন ও দুর্নীতি তুলে ধরেছেন।

গ্রেপ্তারের পর পুলিশের ভ্যানে রিজভীকে তোলার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
রাজপথের কর্মসূচিতে অনড় অবস্থান ও গণমাধ্যমে সোচ্চার ভূমিকার কারণে স্বৈরাচারী সরকারের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দরজা ভেঙে তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তার করা হয়। এত নির্যাতন সহ্য করার পরও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয়নি। মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা করা হয়েছে।
শামসুজ্জামান দুদু :
আওয়ামী লীগ আমলে বিরোধী দলের অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠস্বর ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। বিভিন্ন টকশো, গণমাধ্যম ও রাজপথের সভা-সমাবেশে যুক্তি ও সাহসিকতার সঙ্গে দলের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি।

শামসুজ্জামান দুদুকে কোর্টে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
বারবার গ্রেপ্তার ও জেল-জুলুম সহ্য করেও দল ও নেতৃত্বের প্রতি অনুগত থেকে লড়াই চালিয়ে গেছেন। দলের দুঃসময়ে মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথমে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে মনোনয়নবঞ্চিত হন। দল ক্ষমতায় এলে মন্ত্রিসভায়ও স্থান হয়নি।
জয়নুল আবদিন ফারুক:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ষষ্ঠবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জয়নুল আবদিন ফারুক। আওয়ামী লীগ আমলে সরকারবিরোধী আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা ছিল। তখন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে সংসদ ভবনের সামনে পুলিশের বর্বরোচিত হামলার শিকার হন। রাজনীতিতে যাকে কালো অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করেন অনেকে।

সংসদ ভবনের সামনে পুলিশের বর্বরোচিত হামলার শিকার হন জয়নুল আবদিন ফারুক। ছবি: সংগৃহীত
রাজপথে নির্মমভাবে রক্তাক্ত হওয়ার পরও আন্দোলন থেকে পিছপা হননি। শেষ পর্যন্ত দল ক্ষমতায় এলেও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয়নি নির্যাতিত এই রাজনীতিকের। তার অনুসারী কর্মী-সমর্থকদেরও এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হতাশা প্রকাশ করতে দেখা যায়।
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল:
টকশো ও রাজপথের বক্তৃতায় যেন তৎকালীন আওয়ামী সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দিতেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। তখনকার সরকারবিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে থাকার কারণে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে। ফলশ্রুতিতে তার বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে ৩৫৭টি মামলা।

নয়াপল্টনে এক কর্মসূচি থেকে আলালকে গ্রেপ্তারের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
শারীরিক নির্যাতন ও দীর্ঘ কারাভোগের শিকার হলেও আন্দোলনের মাঠ ছাড়েননি। নয়াপল্টনে এক কর্মসূচি থেকে তাকে গ্রেপ্তারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল।
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল:
বিএনপির রাজপথের আন্দোলনের অন্যতম পোস্টার বয় হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। ঢাকা মহানগর বিএনপির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ৬০০-এর অধিক মামলা হয়।

আদালতে হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। ছবি: সংগৃহীত
মাসের পর মাস আত্মগোপনে থেকে ও বারবার কারাবরণ করেও কর্মী-সমর্থকদের ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন। ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে বন্দি করার দিন ১৪৪ ধারা ভেঙে হাজারো নেতাকর্মী নিয়ে বিক্ষোভ করে বকশীবাজারের অস্থায়ী আদালত পর্যন্ত নিয়ে যান।
বিগত ১৫ বছরে কারাগারের বাইরে থাকা অবস্থায় তাঁর সিংহভাগ সময় কেটেছে আদালত পাড়ায় কিংবা আত্মগোপনে। প্রথমে এমপি মনোনয়ন এবং পরে মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকে।
কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ:
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা সামনে থেকে ভূমিকা রেখেছেন তাদের একজন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ। সরকারবিরোধী আন্দোলন, লাগাতার হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে সক্রিয় ও সোচ্চার ছিলেন।

জুলাই আন্দোলনের শুরুতে গ্রেপ্তার। ছবি: সংগৃহীত
জুলাই আন্দোলনের শুরুতে গ্রেপ্তার হন। তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন ত্বরান্বিত করতে গিয়ে একাধিকবার প্রতিপক্ষের আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছেন।

সেগুনবাগিচা এলাকায় ছাত্রলীগের হাতে নৃশংস হামলার পরে হাসপাতালে। ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায় ছাত্রলীগের হাতে নৃশংস হামলার শিকার হয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৬ (কেশবপুর) আসন থেকে প্রথমে দলীয় মনোনয়ন পেলেও পরে তাঁকে বঞ্চিত করা হয়।
আরও যারা বঞ্চিত:
বিএনপির রাজপথের পরিচিত নেতাদের মধ্যে সাইফুল আলম নীরব অন্যতম। বিরোধী দলে থাকতে তিনি ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের জন্য আতঙ্কের নাম। তার বিরুদ্ধে রয়েছে ৪৫৭টি রাজনৈতিক মামলা। একাধিকবার কারাগারেও যেতে হয়েছে। পরবর্তীতে ঢাকা-১২ আসনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক এই আহ্বায়ককে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তবে বহিষ্কৃত হওয়ার পরও দলের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে নিজের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে নিয়মিত হাজির হন তিনি।
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল গত নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন তালিকায় জায়গা পাননি। দুঃসময়ে সংগঠন ধরে রাখা, কর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং কেন্দ্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে দৃঢ় অবস্থান ছিল তার। প্রার্থী ঘোষণার পর স্থানীয় বিএনপিতে হতাশার সুর দেখা গেছে।
ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু তৃণমূল থেকে উঠে আসা রাজপথের আলোচিত নেতা। ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের কাছে কর্মীবান্ধব নেতা হিসেবে সমাদৃত।
ওয়ান-ইলেভেন থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে ঢাকার রাজপথে সম্মুখ সারিতে থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তিনি যখন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তখন সভাপতি ছিলেন রাজীব আহসান, যিনি ২০২৬ সালে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে বিজয়ী হন এবং পরে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা পান। কিন্তু নরসিংদীর শিবপুর আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হয়েও শেষ পর্যন্ত বঞ্চিত হন আকরামুল হাসান মিন্টু। বর্তমানে দলের কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদেও নেই তিনি।
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিগত ১৫ বছর রাজপথে সোচ্চার ছিলেন। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছেন একাধিকবার। ছাত্রদলের সভাপতি থাকাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে রাস্তায় ফেলে তাকে নির্মমভাবে পেটানো হয়। মগবাজারে তার বাসার নিচেও হামলার শিকার হন। বগুড়া-৫ (শেরপুর-ধুনট) আসন থেকে মনোনয়ন চেয়ে বঞ্চিত হন এবং দলের সুসময়েও ফ্রন্টলাইনের কোনো পদে নেই।
এমএম/এসজাবা