সার্বভৌম সত্তার রাজনীতি, জাতীয় ঐক্য ও আগামীর বাংলাদেশ: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ
সূচনা ও প্রাক-প্রেক্ষিত
কোনো রাষ্ট্র বা সমাজের রাজনৈতিক বিবর্তন আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়; বরং তা ইতিহাস, ভূ-রাজনীতি এবং জনগণের মনস্তাত্ত্বিক চাহিদারই এক অনিবার্য বহিঃপ্রকাশ। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে যে বহুমুখী অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটেই জন্ম নেয় এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক চিন্তা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একদিকে যেমন যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনের বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল, অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার আদর্শিক ধারা নিয়ে এক ধরনের জাতীয় বিভাজন তৈরি হয়েছিল। একদলীয় শাসনব্যবস্থার পটভূমিতে দেশে যখন বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল, ঠিক তখনই রাষ্ট্র পরিচালনার বহুমুখী চিন্তাকে এক ছাতার নিচে আনার তাগিদ অনুভূত হয়।
১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠনের মূল ভিত্তি ছিল রাষ্ট্রকে একক কোনো মতাদর্শে না বেঁধে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া। দক্ষিণপন্থী, বামপন্থী এবং প্রগতিশীল—বিভিন্ন মত ও পথের মানুষদের একত্র করে একটি সুনির্দিষ্ট ‘জাতীয় ঐক্যে’র রূপরেখা তৈরি করাই ছিল তৎকালীন সময়ের চাহিদা। রাষ্ট্র কেবল কতগুলো প্রশাসনিক কাঠামোর সমাহার নয়; রাষ্ট্র হলো নাগরিকের আত্ম পরিচয়ের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এই বোধটিকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে একটি নতুন রাজনৈতিক দল ও দর্শনের আবির্ভাব ঘটেছিল।
‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’: সংজ্ঞা, দর্শন ও প্রাসঙ্গিকতা
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি একটি ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতানির্ভর পরিচয়। প্রশ্ন উঠতে পারে—কেন এই জাতীয়তাবাদ? এবং কেনই বা একটি রাষ্ট্রের জন্য এটি জরুরি?
ভাষাগত পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিল। কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর ভৌগোলিক সীমানা, নৃগোষ্ঠীগত বৈচিত্র্য এবং সামগ্রিক নাগরিক পরিচয় নির্ধারণের প্রশ্নটি সামনে আসে। ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ মূলত একটি নাগরিক (Civic) জাতীয়তাবাদের ধারণা তৈরি করে, যা রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষকে—তিনি যে ধর্ম, বর্ণ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা মতাদর্শেরই হন না কেন—একক রাষ্ট্রীয় সত্তায় যুক্ত করে।
কেন এটি জরুরি?
জাতীয় ঐক্য সুরক্ষা: একটি বহুমাত্রিক সমাজে যেখানে বিভাজনের সম্ভাবনা থাকে, সেখানে রাষ্ট্রীয় সীমানা ভিত্তিক ঐক্য ভিন্ন মতের মানুষকে একসঙ্গে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
সার্বভৌমত্বের ভিত্তি: ভূ-রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের জন্য সার্বভৌম সত্তার শক্তিশালী উপস্থিতি অত্যন্ত প্রয়োজন।
অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয়: এটি কেবল একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক বা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করে না, বরং দেশের সকল স্থায়ী নাগরিককে সমান মর্যাদার ভিত্তি দেয়।
রাষ্ট্র গঠনে রূপরেখার বিবর্তন: ১৯ দফা, ভিশন ২০৩০ ও ৩১ দফা
রাষ্ট্র পরিচালনা ও সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে বিএনপি বিভিন্ন সময়ে নানা কাঠামোগত প্রস্তাব পেশ করেছে। এই প্রস্তাবগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দলটির আদর্শিক ধারাবাহিকতা ও সময়ের সাথে সাথে বদলে যাওয়া রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন বোঝার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
১. প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি
রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা আনা এবং অর্থনীতিকে স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমান তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচির মূল জোর ছিল গ্রামভিত্তিক উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি বিপ্লব, নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা। অর্থনীতিতে বেসরকারী খাতকে উৎসাহিত করা ও রপ্তানিমুখী খাতের রূপরেখা এখান থেকেই গতি পায়।
২. সামাজিক উন্নয়ন ও সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা
পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের মেয়াদে বিশেষ করে নারী শিক্ষা জোরদার করা (বিনামূল্যে নারী শিক্ষা ও উপবৃত্তি), মুক্তবাজার অর্থনীতির বিকাশ, টেলিকম খাতের উন্মুক্তকরণ এবং সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাওয়ার মতো পদক্ষেপগুলো গৃহীত হয়। সামাজিক সুরক্ষাবলয় তৈরি এবং শিক্ষা খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বিষয়টিকে একসময় আন্তর্জাতিকভাবেও ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছিল।
৩. তারেক রহমানের ৩১ দফা: আগামীর রাষ্ট্র সংস্কারের আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি
বর্তমান সময়ের রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ ও নাগরিকদের প্রত্যাশার দিকে তাকিয়ে দলটি ৩১ দফা সংস্কার রূপরেখা পেশ করেছে। এই ৩১ দফাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল একটি সাধারণ দলীয় ইশতেহার নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও ক্ষমতার ভারসাম্য: আইনসভায় বিশিষ্ট নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং একজন ব্যক্তি দু’বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে না পারার মতো কাঠামোগত প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক সংস্কার: বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক রূপান্তর ও যুবসমাজ: বিশ্বায়নের এই যুগে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলা এবং মেগা-প্রকল্প কেন্দ্রিক অপচয় বন্ধ করে টেকসই উন্নয়ন মডেল বাস্তবায়নের দিকে নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দল ও মতের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের আগামীর পথচলা
কোনো রাজনৈতিক দলই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়, এবং অতীতের নানা ভুল-ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা রাজনৈতিক ইতিহাসে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে একটি রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রায় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হওয়া উচিত—তা পর্যালোচনা করা নাগরিকের দায়িত্ব।
বাংলাদেশ বর্তমানে এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে। প্রযুক্তিভিত্তিক আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে রাজনীতির মূল মনোযোগ হওয়া উচিত—
প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা: নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসনিক সংস্থাসমূহকে ব্যক্তি বা দলের প্রভাব মুক্ত রাখা।
পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য: জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে স্বাবলম্বী ও আত্মমর্যাদাশীল অবস্থান তৈরি করা।
রাজনৈতিক পরমতসহিষ্ণুতা: চরমপন্থা ও প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে সুস্থ আলোচনার রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করা।
উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি কেবল ভৌত অবকাঠামো হতে পারে না; প্রকৃত উন্নয়ন হলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার, বাকস্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। আগামীর বাংলাদেশে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সুশাসিত রাষ্ট্র গড়তে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, গণতান্ত্রিক কাঠামোর সুরক্ষাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
লেখক:
শাহ মামুনুর রহমান তুহিন
প্রেসিডেন্ট, গ্লোবাল খুলনা
মোবাইল নম্বর: +8801711903757
ইমেইল: shahmamunurrahmantuhin@gmail.com