ভঙ্গুর অর্থনীতি, ভূ-রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা: বাংলাদেশে নতুন সরকারের সংকট ও উত্তরণের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক রূপান্তরের পরপরই কোনো নবগঠিত সরকার যখন একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে জটিল অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়, তখন দেশের সার্বভৌমত্ব, শান্তি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলের রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ, মেগা প্রকল্পের নামে বিপুল অর্থপাচার, বিদ্যুৎ খাতের কুইক রেন্টাল কেলেঙ্কারী এবং ব্যাংক খাতের ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সরকারকে শাসনভার পরিচালনা করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধাবস্থা, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের তাণ্ডব এবং ভূ-রাজনৈতিক অক্ষের পরিবর্তন। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিরোধীদের লাগাতার আন্দোলন, রাজপথ অবরোধ এবং কৃত্রিম ‘মব’ (Mob) বা জনরোষ তৈরির অপচেষ্টা। এই গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণে খতিয়ে দেখা হয়েছে কিভাবে এই অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত, কিভাবে এটি প্রকারান্তরে পতিত স্বৈরাচারকে পুনরুত্থানের পথ তৈরি করে দিচ্ছে, এবং বিশ্ব ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে কীভাবে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, রোমানিয়া বা রুয়ান্ডার মতো দেশগুলো অনুরূপ সংকট কাটিয়ে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল।

​১. সূচনা: পরিবর্তন পরবর্তী বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সংকট
​যেকোনো রাষ্ট্রের ইতিহাসের মোড় ঘোরার মুহূর্তগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ভঙ্গুর হয়। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর জনগণের মনে যে নতুন প্রত্যাশার উন্মেষ ঘটে, বাস্তবতার নির্মম মুখোমুখি হয়ে তা প্রায়শই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ঠিক এমনই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। একদিকে দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের রেখে যাওয়া পচা-গলা অর্থনৈতিক কাঠামো, অন্যদিকে পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা—এই দ্বিমুখী চাপের মুখে দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা একটি হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
​একটি দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর কখনোই মসৃণ পথরেখা ধরে হেঁটে চলে না। স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর প্রশাসনিক শূন্যতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি রাতারাতি মেরামত করা সম্ভব নয়। কিন্তু জনমানসে তাৎক্ষণিক ফলাফলের যে আকুলতা থাকে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে দেশী ও বিদেশী কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে যে বহুমুখী সঙ্কট দৃশ্যমান, তা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে এক গভীর ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত প্রেক্ষাপট।

​২. উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিষবৃক্ষ: বিগত শাসনামলের অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ
​বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় বাধাটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং বিগত স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক খাতগুলোর ভয়াবহ ক্ষত। বিগত দেড় দশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক ধরণের ‘উন্নয়ন রাজনীতি’ বা মেগা-প্রকল্প কেন্দ্রিক প্রচারণা চালানো হয়েছিল, যার অন্তরালে গড়ে উঠেছিল এক নজিরবিহীন লুটেরা পুঁজিবাদ (Crony Capitalism)।

​২.১ অর্থপাচার ও আর্থিক খাতের ধস
​গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (GFI) এবং দেশীয় শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদদের তথ্যমতে, বিগত শাসনামলে দেশ থেকে বার্ষিক গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মূলধন অবৈধ উপায়ে পাচার হয়েছে। ট্রেড মিসইনভয়েসিং (বাণিজ্যে মিথ্যা ঘোষণা), হুন্ডি এবং শেল কোম্পানির মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যা একসময় ৪-৫ বিলিয়ন ডলারের কৃত্রিম স্থিতিশীলতায় দেখানো হয়েছিল, তা প্রকৃত অর্থে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ভুয়া ঋণ, খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট কিছু অলিগার্ক বা গোষ্ঠীপতিদের হাতে ব্যাংকগুলোর মালিকানা হস্তান্তরের মাধ্যমে।

​২.২ কুইক রেন্টাল ও বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা
​জ্বালানি খাতে ‘বিশেষ আইন’ বা ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি আইনের সুযোগ নিয়ে যে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছিল, তা দেশের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই হাজার হাজার কোটি টাকা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠীকে প্রদান করা হয়েছে। এই আমদানিনির্ভর ও অসম চুক্তিগুলোর কারণে বর্তমানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এক বিশাল দেনার দায়ে জর্জরিত, যা প্রতিদিন নতুন সরকারের ওপর মারাত্মক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

​২.৩ বৈদেশিক ঋণের ফাঁদ ও মেগা প্রকল্পের অপচয়
​প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়ে নির্মিত বহু মেগা প্রজেক্টের ঋণের কিস্তি শোধের সময় এখন উপস্থিত হয়েছে। এডিবি, বিশ্বব্যাংক, চীন, রাশিয়া ও ভারতের কাছ থেকে চড়া সুদে ও কঠিন শর্তে নেওয়া ঋণের বোঝা এখন জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ শোষণ করে নিচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে।

​৩. আন্তর্জাতিক সংকট ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রভাব
​আভ্যন্তরীণ অর্থনীতির এই নাজুক অবস্থার মধ্যেই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট আরো জটিল আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন করে অস্থির করে তুলেছে।

​৩.১ জ্বালানি তেল ও এলএনজি সংকট
​মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটার কারণে বিশ্ববাজারে খনিজ তেলের দাম হু-হু করে বাড়ছে। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি এক মরণফাঁদ। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে সময়মতো জ্বালানি আমদানি করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কারখানার উৎপাদন এবং কৃষির সেচ ব্যবস্থার ওপর।

​৩.২ খাদ্য ও নিত্যপণ্যের মুদ্রাস্ফীতি
​আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply Chain) ভেঙে পড়া এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়ার ফলে বিশ্বজুড়ে পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়েছে। ফলে সার, গম, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। এই আন্তর্জাতিক মূল্যবৃদ্ধি দেশীয় বাজারে মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় আঘাত হানছে।

​৪. বিরোধী আন্দোলন, বিশৃঙ্খলা ও ‘মব’ সংস্কৃতির আড়াল: ষড়যন্ত্রের স্বরূপ
​এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে, যখন রাষ্ট্রের সর্বাত্মক মনোযোগ দেওয়া উচিত ছিল অর্থনৈতিক সংস্কার ও জনগণের চরম কষ্ট লাঘবে, ঠিক তখনই দেশে দেখা যাচ্ছে লাগাতার ধর্মঘট, রাজপথ অবরোধ এবং কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা ‘মব’ বা জনরোষের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা।

​৪.১ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও টাইমিং
​গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দাবি আদায়ের আন্দোলন স্বাভাবিক অধিকার। কিন্তু একটি সরকার মাত্র কয়েক মাস দায়িত্ব নেওয়ার পর, যখন তারা অতীতের বিশাল ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করার কাজে ব্যস্ত, তখন যদি প্রতিনিয়ত সড়ক অবরোধ, যানবাহন ভাঙচুর এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা তৈরির চেষ্টা করা হয়, তবে তার পেছনে সাধারণ জনগণের স্বার্থ কতটুকু আর রাজনৈতিক ফায়দা কতটুকু—তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এই ধরণের অস্থিতিশীলতা শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করছে, বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিনষ্ট করছে এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের রুটি-রুজির ওপর আঘাত হানছে।

​৪.২ এটি কি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ?
​ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো দেশে যখন কোনো স্বাধীন বা জনবান্ধব সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে চায়, তখন দেশী-বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো সেটিকে অস্থিতিশীল করতে চায়। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় অত্যন্ত কৌশলগত। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা এই দেশটি যদি শান্ত ও সমৃদ্ধ হয়, তবে অনেক আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির একক প্রভাব হ্রাস পায়। ফলে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সরকারকে দুর্বল, বেকায়দায় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সাহায্যপ্রার্থী করে রাখার পেছনে অশুভ অক্ষের হাত থাকার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

৪.৩ পতিত স্বৈরাচারকে প্রকারান্তরে সুবিধা প্রদান
​সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই অস্থিতিশীলতা ও ‘মব’ সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ লাভবান হচ্ছে পতিত স্বৈরাচার ও তাদের দোসররা।
​পাপের দায় হস্তান্তর: বিগত ১৫ বছরের শাসনকালের ভয়াবহ দুর্নীতি, অর্থপাচার ও প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞের যে ক্ষোভ জনগণের মনে ছিল, রাজপথের অস্থিতিশীলতার কারণে তা নতুন সরকারের দিকে চালিত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
​ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহতকরণ: দেশে বিশৃঙ্খলা থাকলে স্বৈরাচারের দোসরদের বিচার, পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং অপরাধীদের গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া শ্লথ হয়ে পড়ে।
​আন্তর্জাতিক বার্তা: বিশ্বমঞ্চে এই বার্তা দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয় যে, “স্বৈরাচারী শাসনই স্থিতিশীলতার জন্য ভালো ছিল, গণতান্ত্রিক রূপান্তর কেবল বিশৃঙ্খলা আনে।” এই বয়ান তৈরি করা পতিত শক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

​৫. সংকট কাটিয়ে উঠে উন্নত হওয়া দেশসমূহের ঐতিহাসিক শিক্ষা
​ইতিহাস প্রমাণ করে, বাংলাদেশই প্রথম দেশ নয় যেটি একই সাথে অভ্যন্তরীণ ধ্বংসাবশেষ, দেউলিয়া অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়েছে। বিশ্বের বহু দেশ চরম ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে আজ উন্নত রাষ্ট্রের মর্যাদায় আসীন হয়েছে। তাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য আলোকবর্তিকা হতে পারে।

​৫.১ সিঙ্গাপুর: শূন্য থেকে অর্থনৈতিক পরাশক্তি
​১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া থেকে বিতাড়িত হয়ে যখন সিঙ্গাপুর স্বাধীন হয়, তখন দেশটির কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না, পানীয় জলের জন্য প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভর করতে হতো, ছিল চরম জাতিগত দাঙ্গা, কমিউনিস্টদের উস্কানি এবং বেকারত্ব।
​জিরো টলারেন্স টু করাপশন: লি কুয়ান ইউ-এর নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতম অবস্থান নেয়।
​আইনের শাসন ও কঠোর শৃঙ্খলা: বিশৃঙ্খলা ও দাঙ্গা রুখতে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হয়।
​মেরিটোক্রেসি (যোগ্যতার মূল্যায়ন): দলমত নির্বিশেষে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিদের প্রশাসনে সুযোগ দেওয়া হয়।
​বৈদেশিক বিনিয়োগবান্ধব নীতি: বিশ্বমানের অবকাঠামো ও সহজ ব্যবসা করার পরিবেশ তৈরি করে বিদেশী ক্যাপিটাল আকর্ষণ করা হয়।

​৫.২ দক্ষিণ কোরিয়া: যুদ্ধের ছাই থেকে বিশ্বপ্রযুক্তি কেন্দ্র
​১৯৫০-এর দশকের কোরিয়ান যুদ্ধের পর দেশটি ছিল বিশ্বের অন্যতম দরিদ্রতম অঞ্চল। মাথাপিছু আয় ছিল আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোর চেয়েও কম।
​রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন (Export-led Industrialization): বস্ত্র খাত থেকে শুরু করে পরবর্তীতে স্টিল, জাহাজ নির্মাণ ও ইলেকট্রনিক্স (স্যামসাং, হাই Diversity) খাতে মনোযোগ দেওয়া।
​’সেমাউল উন্দোং’ বা নতুন গ্রাম আন্দোলন: জাতীয় ঐক্য ও গ্রামভিত্তিক কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা গড়ে তোলা।
​শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: শিক্ষার ওপর সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়ে দক্ষ কারিগরি জনশক্তি তৈরি।

​৫.৩ রোমানিয়া ও পূর্ব ইউরোপ: স্বৈরাচার উত্তর অর্থনৈতিক উত্তরণ
​১৯৮৯ সালে স্বৈরাচারী নিকোলাই চসেস্কুর পতনের পর রোমানিয়া চরম মূল্যস্ফীতি, বিশাল ঋণ এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় পড়েছিল।
​প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: বিচার বিভাগ ও ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা।
​ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে সংহতি: বাজার অর্থনীতিতে রূপান্তর এবং দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা (DNA) গঠন করে হাজার হাজার দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা ও রাজনীতিবিদকে বিচারের আওতায় আনা।

​৫.৪ রুয়ান্ডা: গণহত্যার গৃহযুদ্ধ থেকে আফ্রিকান অলৌকিক পুনরুত্থান
​১৯৯৪ সালের ভয়াবহ গণহত্যায় মাত্র ১০০ দিনে ৮ লাখ মানুষ নিহত হয়, অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
​জাতীয় পুনর্মিলন ও চরম বিচারিক কঠোরতা: ‘উমুগান্দা’ (সম্প্রদায়িক সেবা) এবং কঠোর দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা।
​ডিজিটালাইজেশন ও ব্যবসা সহজীকরণ: ব্যবসাকে সম্পূর্ণ কাগজবিহীন ও দ্রুততম সময়ে চালুর ব্যবস্থা।

​৬. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংকট নিরসনের কৌশলগত রোডম্যাপ
​ইতিহাসের শিক্ষা এবং বর্তমান বাস্তবতার আলোকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য নিম্নলিখিত কৌশলগত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে:

​৬.১ জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা
​সরকারকে অবিলম্বে দায়িত্বশীল বিরোধী দল, সুশীল সমাজ, ছাত্র-জনতা ও সকল অংশীজনদের সাথে সংলাপের মাধ্যমে একটি ‘জাতীয় সনদে’ পৌঁছাতে হবে। রাজপথে নৈরাজ্য ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আইনি উভয়ভাবেই কঠোর অবস্থান নিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ‘মব জাস্টিস’ বা বেআইনি মব সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।

​৬.২ অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা ও সংস্কার
​ব্যাংক খাতের পুনরুদ্ধার: কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিয়ে একটি স্বাধীন ‘ব্যাংকিং কমিশন’ গঠন করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।
​পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার: আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন MIGA, StAR, Egmont Group) এবং বিদেশী রাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার আইনি লড়াই জোরদার করা।
​জ্বালানি খাতের চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন: বিগত সরকারের করা অসম ও দুর্নীতিগ্রস্ত কুইক রেন্টাল চুক্তিগুলো অবিলম্বে বাতিল বা পুনর্নির্ধারণ করা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে দ্রুত নজর দেওয়া।

৬.৩ প্রশাসনিক দক্ষতা ও শূন্য সহনশীলতা দুর্নীতি নীতি
​প্রশাসনে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে পেশাদারিত্ব ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সম্পূর্ণ স্বাধীন ও ক্ষমতাবান করতে হবে, যাতে যেকোনো স্তরের দুর্নীতিবাজদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা যায়।

৬.৪ কৌশলগত ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য
​আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির দিকে অতিরিক্ত হেলে না পড়ে জাতীয় স্বার্থনির্ভর স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য, পাশ্চাত্য এবং এশীয় বাণিজ্যিক অংশীদারদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করে জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

​৭. উপসংহার
​সংকট যত গভীরই হোক না কেন, তা কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব নয়। একটি নতুন সরকারের জন্য শুরুর কয়েক মাস অত্যন্ত সংকটপূর্ণ হলেও এটিই ইতিবাচক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সুযোগ। বিগত স্বৈরাচারের দুর্নীতি, ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি কিংবা আন্তর্জাতিক বিরূপ পরিস্থিতি—কোনোটিই পরাস্ত করতে পারবে না যদি সরকারের পেছনে জনগণের আস্থা, কঠোর শৃঙ্খলা এবং সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকে।
​আজকের দিনে বাংলাদেশে যে আন্দোলন, অবরোধ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার অপচেষ্টা হচ্ছে, তা প্রকারান্তরে অতীত অপশাসনকে টিকিয়ে রাখা বা তাদের পুনর্বাসনের পথ প্রশস্ত করার শামিল। দেশবাসীকে এই গভীর ষড়যন্ত্র বুঝতে হবে। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই নতুন ভোরের সূর্য উদয় হয়—সিঙ্গাপুর, কোরিয়া বা রুয়ান্ডার ইতিহাস আমাদের সেই সাক্ষ্যই দেয়। এখন প্রয়োজন কেবল সুদৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং জাতীয় ঐক্য।

​লেখক: প্রেসিডেন্ট গ্লোবাল খুলনা

শাহ মামুনুর রহমান তুহিন
+8801711903757
shahmamunurrahmantuhin@gmail.com