৩০ বছরের ট্রেন ৮ বছরেই মর্গে! সরকারি সম্পদ সংরক্ষণে নেই দায়িত্বশীলতা।

সাড়ে ছয়শ কোটি টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল ২০টি ডেমু ট্রেন। কথা ছিল অন্তত ৩০ বছর চলবে এগুলো। কিন্তু তদারকির অভাবে আট বছর না পেরোতেই হয়ে পড়েছে পুরোপুরি বিকল। ২০২০ সাল থেকে সেগুলো পড়ে আছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন লোকোশেডে। অথচ শুরুতেই কারিগরি ত্রুটি সারানো গেলে এখনো চলাচল করতে পারত ট্রেনগুলো।

কুমিল্লার লাকসাম রেলওয়ে জংশনের লোকোশেডে দেখা মিলল তেমনই একটি নষ্ট ডেমু ট্রেনের। অযত্নে দাঁড়িয়ে থাকা ৩০ কোটি টাকা দামের ট্রেনটি যেন কর্তৃপক্ষের অবহেলার নিদর্শন।

বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে চীনের তৈরি এসব ট্রেন আমদানি করেছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। খরচ হয়েছিল প্রায় সাড়ে ছয়শ কোটি টাকা। পরিকল্পনা ছিল, লাকসাম-নোয়াখালী, লাকসাম-চাঁদপুর, লাকসাম-আখাউড়া, লাকসাম-ফেনী এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতকারী নিম্নআয়ের মানুষের দ্রুত ও কম খরচে চলাচল নিশ্চিত করা। পূর্বাঞ্চলে একসময়  ৫৪ জোড়া অর্থাৎ ১০৮টি ট্রেন চলাচল করত। এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ জোড়ায় অর্থাৎ ৭২টি।

ডেমু ট্রেন বন্ধ হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন

সাধারণ যাত্রীরা।লাকসাম জংশনের কাউন্টারে টিকিটের জন্য লম্বা লাইন। এক দিনে যেখানে অনেক যাত্রী টিকিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে, অন্যদিকে সাদা ডেমু ট্রেনগুলো শ্যাওলা জমে হয়ে পড়েছে সবুজ। এরই মধ্যে অনেক যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে গেছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে লাকসাম লোকোশেডের দুই কর্মচারীকে বদলিও করা হয়েছে। কিন্তু ট্রেনটি পড়ে আছে আগের মতোই, একলা।

কাজের প্রয়োজনে প্রায়ই লাকসাম থেকে কুমিল্লা যেতে হয় আমির হোসেনকে। তিনি বলছিলেন, ‘আগে স্বল্প দূরত্বে সহজেই ট্রেনে যেতাম। এখন ট্রেনও চলে না, টিকিটও মেলে না। বাধ্য হয়ে বাসে যাচ্ছি।’ আরেক যাত্রী ইয়াছিন ফাহাদও ডেমু ট্রেনগুলোর অভাব অনুভব করছেন বলে আক্ষেপ করলেন। তার মতে, ‘ডেমু থাকলে একটি ট্রেনেই শত শত যাত্রী যেত। এখন সেই সুযোগ নেই।’

আমদানি করা ২০টি ডেমু ট্রেন অকেজো হয়েপড়ে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করলেন বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভিরুল ইসলাম।

লাকসাম রেলওয়ে জংশনে কর্মরত জ্যেষ্ঠ সহকারী লোকোমাস্টার মো. খলিলুর রহমান চৌধুরী নিজেই বললেন ট্রেনের অভাবে বাসে যাতায়াতের কথা।জানালেন, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই এই ট্রেনগুলো পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়ে আছে।

ডেমু ট্রেনের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে লাকসাম রেলওয়ে জংশনের স্টেশন মাস্টার মো. ওমর ফারুক ভূঁইয়া বললেন, ‘ডেমু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা বেশি ভুগছেন। এখন আসনভিত্তিক টিকিটের চাহিদাও তিন গুণ বেড়েছে।’ ডেমু ট্রেন চালু থাকাকালে সে খাত থেকে ভালো রাজস্ব আয় হতো জানিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘যদি ট্রেনগুলো মেরামত করে চালু করা যায়, তাহলে আবার স্বল্প ব্যয়ে যাত্রী সাধারণের অনেকটা চাহিদা পূরণ করা যাবে।’

এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বললেন, ‘একটি প্রবাদ আছে, সরকারি মাল-দরিয়ায় ঢাল। এই ট্রেনগুলো যেন তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। ২০১২ সালে প্রায় সাড়ে ছয়শ কোটি টাকায় ৩০ বছর মেয়াদের এই ডেমু ট্রেনগুলো আমদানি করা হয়। কিন্তু মাত্র আট বছরের মাথায় ট্রেনগুলো পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়ল। এখনো কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে সেগুলো মেরামত করে চালু করা যায়। এতে স্বল্প আয়ের যাত্রীদের উপকার হবে। কিন্তু সমস্যার শিকড় আরও গভীরে। সে কারণেই ট্রেনগুলো নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।’

কেন ট্রেনগুলো যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়নি, তা জানতে কথা হয় রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা বলছেন, এসব আধুনিক ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও জনবল ছিল না। যে কারণে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে ট্রেনগুলো। মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। যতদিন না নতুন ট্রেন আমদানি হচ্ছে কিংবা বিকল ডেমুগুলো মেরামত করা হচ্ছে, ততদিন পূর্বাঞ্চলের রেলব্যবস্থার সংকট কাটবে না বলেই মনে করছেন তারা।

ট্রেনগুলোর বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী-ডিএমই (লোকো/ক্যারেজ) রেজওয়ান উল ইসলামকে একাধিকবার টেলিফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভিরুল ইসলাম বললেন, ‘লোকোমোটিভ সংকটের কারণে ডেমু ছাড়াও বিভিন্ন রুটে চলাচল করা অনেক ট্রেন বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ রয়েছে অনেক রেলস্টেশন। এ ছাড়া দুর্বল লোকোমোটিভের ফলে চলাচলের সময় ট্রেন আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিকল হয়ে পড়ে। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে অনেক ট্রেনের নির্ধারিত শিডিউলেও চরম বিপর্যয় ঘটছে।

  • ২০১২ সালে চীন থেকে কেনা হয় ২০ ডেমু ট্রেন
  • প্রতিটির দাম ৩০ কোটি টাকা
  • ২০২০ সাল থেকে পড়ে আছে লোকোশেডে
  • নেই রক্ষণাবেক্ষণ, গায়ে জমছে শ্যাওলা

###