সিনিয়রদের সঙ্গে ‘সখ্যই’ কাল হলো অপ্রতিমের
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিন তরুণকে আটক করেছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে একে একে তাদের আটক করা হয়। তাদের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। পুলিশ বলছে, প্রাথমিকভাবে তাদের তিনজনেরই অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর পরিবারের সঙ্গে দুপুরের খাবার খায় অপ্রতিম। পরে বন্ধুদের সঙ্গে আইফোন দিয়ে ছবি তুলতে বাইরে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয় সে। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত তার মুঠোফোনের অবস্থান কুমিল্লার গন্ধমতী এলাকায় শনাক্ত হলেও এরপর ফোনটির আর কোনো অবস্থান পাওয়া যায়নি।
অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘শুক্রবার জুমার নামাজের পর অপ্রতিম আমাদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খায়। পরে বন্ধুদের সঙ্গে আইফোন দিয়ে ছবি তুলতে বাইরে যেতে চায়। কিন্তু আর ফিরে আসেনি।’
এ ঘটনায় কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি। অপ্রতিমকে খুঁজতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও পুলিশ ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে।
ফুটেজে দেখা যায়, অপ্রতিমের সঙ্গে ক্যাপ পরা এক তরুণ সানন্দা পাহাড়ের দিকে যাচ্ছে। পরে আশপাশের একটি বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজেও ওই তরুণকে অপ্রতিমকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। স্থানীয়দের সহায়তায় ওই তরুণের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। তার নাম তুহিন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য মাহমুদুল হাসান রাহাত বলেন, শুক্রবার রাতভর সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অপ্রতিমকে এক যুবকের সঙ্গে সানন্দা পাহাড়ের দিকে যেতে দেখা যায়। স্থানীয়দের ফুটেজের স্ক্রিনশট দেখালে তারা ওই যুবককে সানন্দা এলাকার নুরে আলমের ছেলে তুহিন হিসেবে শনাক্ত করেন।
শনিবার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর কোটবাড়ি এলাকা থেকে তুহিনকে আটক করে ডিবি পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শাহরিয়া আনাস ও মো. ফাহিম নামে আরও দুজনকে আটক করা হয়। তাদের প্রত্যেকের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে।
পুলিশের ভাষ্য, আটক তিনজনই অপ্রতিমের পরিচিত ও সিনিয়র বন্ধু। তাদের সঙ্গে অপ্রতিমের সখ্য ছিল। এদের মধ্যে তুহিনের বিরুদ্ধে নানান অপরাধের অভিযোগও রয়েছে।
পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য ও উদ্ধার হওয়া আলামত যাচাই করে হত্যাকাণ্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তুহিনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। শনিবার রাত ৮টার দিকে সালমানপুর এলাকায় তুহিনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কোদালের হাতলসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
শনিবার দুপুরে সানন্দা পাহাড়ি এলাকা থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে তার মাথায় গুরুতর আঘাত এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের চিহ্ন পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। শনিবার বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে রাতে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, সানন্দা পাহাড়ি এলাকাটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে প্রায় আড়াই কিলোমিটার এবং অপ্রতিমের বাড়ি থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসান বলেন, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় মামলা হয়নি। রোববার পরিবার মামলা করবে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে।
অপ্রতিম স্থানীয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান সে।
এদিকে অপ্রতিমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে বিক্ষোভ করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবিতে তারা ১২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। দাবি পূরণ না হলে বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় জেলা পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।