উদ্ধার হওয়া অর্থ স্ব স্ব বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হয়েছে। সম্প্রতি নাটোরের সিংড়া উপজেলার সুকাশ ইউনিয়নের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের টাকা আত্মসাৎ করার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় নানা সমালোচনা শুরু হয়।
ফেরত এলো বিদ্যালয়ের টাকা
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ‘বিদ্যালয়ের ৩ লাখ ৭০ হাজার নিয়ে গেলেন বিএনপির দুই নেতা’ শিরোনামে বাংলা ট্রিবিউনে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর ওই দুই নেতাকে টাকা ফেরতে এক সপ্তাহের সময় দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
দলীয়ভাবে চাপ তৈরি হলে স্থানীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলামের হস্তক্ষেপে ওই দুই নেতা রোববার বিকালে এসে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে হাজির হয়ে প্রধান শিক্ষকের হাতে সমপরিমাণ টাকা ফেরত দেন।
বেলোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদ রানা বলেন, বিএনপির অভিযুক্ত দুই নেতা বিদ্যালয়ের ২ লাখ টাকা তার হাতে ফেরত দিয়েছেন। উদ্ধার অর্থ প্রতিষ্ঠানের যৌথভাবে পরিচালিত সিংড়া সোনালী ব্যাংকের হিসাব নম্বরে জমা দিয়েছেন। জমা ভাউচারটিও সোমবার শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিশ্চিত করেছেন তিনি।
বেলোয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, তার প্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছিল। এর মধ্যে বিএনপি নেতা আজমল হোসেন ১ লাখ ও বিএনপি নেতা আব্দুস সোবহান ৭০ হাজার টাকা পৃথকভাবে ফেরত দিয়েছেন। তিনিও ফেরত আসা টাকা বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবে জমা রেখেছেন।
কী ঘটেছিল
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, বেলোয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও বেলোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা নেতা আবদুস সোবহান নয়ন সুকাশ ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। অপর ব্যক্তি আজমল হোসেন একই ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, বিএনপির ওই দুই নেতার ভাগাভাগি করে নেওয়া ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা দুটি বিদ্যালয়ের জমি ইজারা থেকে এসেছিল। জুন মাসে মাইকিংয়ের পর প্রকাশ্য ডাকের মাধ্যমে বিদ্যালয় দুটির ১৫ একর জমি ইজারা দেওয়া হয় ৬ লাখ ৭১ হাজার ৬২৫ টাকায়। এর মধ্যে ২৪ জুন বেলোয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ২১ বিঘা জমি তিন লাখ ৭৭ হাজার ২৫০ টাকায় এবং ২৮ জুন বেলোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৫ বিঘা জমি ২ লাখ ৯৪ হাজার ৩৭৫ টাকায় গ্রামের কৃষকদের কাছে এক বছরের জন্য ইজারা (লিজ) দেওয়া হয়।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশ্য ডাক শেষ হওয়ার পর ইজারা গ্রহণকারীরা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের হাতে টাকা বুঝিয়ে দেন। তখনই উপস্থিত লোকজনের সামনেই বেলোয়া গ্রামের উন্নয়নের কথা বলেন বিএনপির ওই দুই নেতা। এক পর্যায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লিজ থেকে আসা ২ লাখ ৯৪ হাজার ৩৭৫ টাকার মধ্যে ২ লাখ টাকাই নিয়ে নেন বিএনপি নেতা সোবাহান ও আজমল। একই কায়দায় বেলোয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকেও এক লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়ে যান অভিযুক্তরা। পরে তারা দুই জন ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা ভাগাভাগি করে নেন। ঘটনার পর দুটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১০ শিক্ষক-কর্মচারী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমিজমা লিজের টাকা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা হয়। কিন্তু প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠানের টাকা জোর করে বিএনপির দুই নেতা নিয়ে গেলেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাদের এই দুটি বিদ্যালয়ে এমন ঘটনা ঘটেনি। বিষয়টি শিক্ষক কর্মচারীরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। তবে শেষ পর্যন্ত টাকা ফেরত আসায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
ধোঁকাবাজি করে বিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাতের বিষয়টির নিন্দা জানিয়েছে সুকাশ ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আখতারুজ্জামান ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বলেন, গ্রামের উন্নয়নের কথা বলে দলীয় দাপটে বিদ্যালয়ের টাকা ভাগাভাগি করে নেওয়াটা খুবই দুঃখজনক। এতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও গ্রামের মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলে অভিযুক্তরা টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছেন।
স্থানীয় বিএনপির আরেক নেতা হাফিজুর রহমান বলেন, এক সময়ের আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপি সেজে অর্থ আত্মসাতের মতো এই ধরনের অন্যায় কাজ করে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন।
টাকা ফেরত দেওয়ার পর অভিযুক্ত বিএনপি নেতা আব্দুস সোবহান ওরফে নয়ন ও আজমল হোসেনের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিংড়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিশাত আনজুম বলেন, উদ্ধার হওয়া ৩ লাখ ৭০ হাজার দুই বিদ্যালয়ের হিসাবে জমা রাখা হয়েছে।