গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ নথি ফাঁস, তথ্য পাচার সন্দেহে থানার রাইটারদের গণবদলি
থানার কম্পিউটার অপারেটরের দায়িত্বে থাকেন একাধিক কনস্টেবল। তাদের সবাই চেনে থানার রাইটার হিসেবে। মূলত এই রাইটারদের দিয়েই অনলাইন জিডি লেখা থেকে শুরু করে থানার সব গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় নথি লেখানো হয়। এসব নথি প্রয়োজনে তারা সার্ভারেও আপলোড করেন। বছরের পর বছর ধরে এই দায়িত্ব পালন করে আসলেও এবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সন্দেহের তালিকায় থানার রাইটাররা। সেই ‘সন্দেহ’ থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০টি থানার রাইটারদের গণবদলি করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে মিলেছে এসব তথ্য।
অবশ্য, বদলির আদেশে এক সঙ্গে এতো রাইটারদের বদলির কারণ উল্লেখ করা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে ‘জনস্বার্থে’ এই বদলি। যদিও তাদের প্রত্যেককেই ডিএমপির অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ এবং নন অপারেশনাল ইউনিটগুলোতে বদলি করা হয়েছে। এই ধরনের পদে সাধারণত এক থানা থেকে অন্য থানায় দায়িত্ব দেওয়া হলেও এবার তাদের কোনো থানায় না পাঠিয়ে তাদের বেশির ভাগকেই পুলিশের রিজার্ভ শাখায় পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নানা কারণেই এসব রাইটারদের সন্দেহ করা হচ্ছে। এসব রাইটারদের কেউ কেউ চাকরিচ্যুত ও পলাতক অনেক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। নন অপারেশনাল ইউনিটগুলোতে সংযুক্ত থাকা আওয়ামী লীগ আমলের দাপুটে পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ নথি ফাঁস করে দিচ্ছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এজন্যই তাদের এক সঙ্গে বদলি করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন কর্মকর্তা প্রতিবেদককে বলেছেন, রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার অফিসার ইনচার্জ রাকিবুল হাসানের অডিও ভাইরালের পর মূলত তারা নড়েচড়ে বসেছেন। এই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে নানা কার্যক্রম চলছে। এর অংশ হিসেবে ডিএমপির আট ক্রাইম বিভাগের বিভিন্ন থানায় কর্মরত কমপিউটার অপরেটরদের (রাইটার) অনেককেই বদলি করা হয়েছে। অনেকের কার্যক্রমও নজরদারিতে রয়েছে।
নিউজ হাউজের হাতে এমন একাধিক বদলির তালিকা এসেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারের বদলির নম্বর ৪৪৪৩ আদেশে বিভিন্ন ক্রাইম বিভাগের থানায় কর্মরত কম্পিউটার অপরেটরদের বদলির আদেশ দেওয়া হয়। আদেশে ডিএমপি উপ-কমিশশনার (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) শাহরিয়ার আলী ও অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) ফাহমিদা হক শেলী সই করেছেন। থানার রাইটারদের এক যোগে বদলির বিষয়ে জানতে পুলিশের এই দুই কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বদলির আদেশ পাওয়া বিভিন্ন বিভাগের কম্পিটার অপরেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তারা বিভিন্ন জেলার কম গুরুত্বপূর্ণ থানায় কর্মরত ছিলেন। পরে বিভিন্ন জেলা থেকে ডিএমপিতে বদলি করে আনা হয়। দক্ষতা অনুযায়ী বিভিন্ন থানায় বদলি করা হয়। ফলে ৫ আগস্টের আগে কর্মরত ও পলাতক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা তাদের কাছে কোনো তথ্য পাচারের অভিযোগ সঠিক নয়। তবে কারো বিরুদ্ধে তথ্য প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। সবাইকে গণহারে বদলির ফলে কর্মরত অন্য পুলিশ সদস্যরাও এখন বদলি আতঙ্কে রয়েছেন।
এদিকে কম্পিউটার অপরেটরদের (রাইটার) তদারকির দায়িত্ব থাকে সংশ্লিষ্ট থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদমর্যাদার কর্মকর্তার ওপর। থানায় তাদের বলা হয় ‘স্টেটমেন্ট অফিসার’। একাধিক স্টেটমেন্ট অফিসারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একযোগে কমপিউটার অপরেটরদের বদলি করা হলেও সোমবার পর্যন্ত নতুন কাউকে পদায়ন করা হয়নি। এতে ওই পদে জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। পাশপাশি থানার নিয়মিত কাজে ব্যাঘাত ঘটছে।
ডিএমপির দুটি থানার ওসির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাইটার পদে কাজ জানা ও অভিজ্ঞদের পদায়ন না দিলে দৈনন্দিন কাজে সমস্যা হতে পারে। এতে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতেও ভোগান্তি হতে পারে।
ডিএমপির গুরুত্বপূর্ণ একটি থানার স্টেটমেন্ট অফিসার প্রতিবেদককে বলেন, তার থানায় চারজন রাইটার দায়িত্ব পালন করত। তারা দিন-রাত কাজ করলেও কাজের চাপ শেষ হতো না। তাদের মধ্য থেকে ৩ জনকে বদলি করে দেওয়া হলেও নতুন পদায়ন হয়নি। এতে থানার প্রায় সব কাজ থমকে আছে।
থানা থেকে কম্পিটার অপরেটরদের (রাইটার) একযোগে বদলির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অ্যাডমিন বিভাগে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত কমিশনার মো. মাসুদ করিম প্রতিবেদককে বলেন, তথ্য পাচারের কথাটা সঠিক নয়। এগুলো নিয়মিত বদলির অংশ হিসেবেই করা হয়েছে; কিন্তু বদলি হওয়া সদস্যদের কেউ রাখতে চাইলে সেখানে তাদের রাখা হচ্ছে।
- এমএম/এসজাবা