সিলেট থেকে বিশ্বমঞ্চে বঙ্গকন্যা, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এখন জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন
ঢাকায় জন্ম। কৈশোরে পাড়ি জমিয়েছিলেন উত্তর আয়ারল্যান্ডে। এরপর যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ডে আইন পড়েছেন। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন আইন নিয়ে কাজ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে জাতিসংঘের বিশেষ দায়িত্ব। দীর্ঘ কর্মজীবনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশি আইনজীবী আইরিন জুবাইদা খান। ২০২৬ সালের ২৮ আগস্ট তাঁর ক্যারিয়ারে যুক্ত হয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। ওই দিন তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করার মধ্য দিয়ে নতুন দায়িত্ব শুরু করেন আইরিন খান। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এখন জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
আইরিন খানের জন্ম ১৯৫৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর ঢাকায়। শৈশবের একটি বড় সময় কেটেছে বাংলাদেশে। পরে পড়াশোনার জন্য তিনি উত্তর আয়ারল্যান্ডে যান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। হার্ভার্ড ল স্কুলের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। এসব অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার নিয়ে তাঁর কাজের প্রতি আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ল স্কুলে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেন। হার্ভার্ডে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পড়াশোনা ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়।
পড়াশোনা শেষ করার পর তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় শুরু হয় জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ে। ইউএনএইচসিআরে প্রায় ২১ বছর কাজ করেন তিনি। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের দায়িত্বও পালন করেন। ভারতের চিফ অব মিশন এবং ইউএনএইচসিআরের ডিভিশন অব ইন্টারন্যাশনাল প্রটেকশনের উপপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
২০০১ সালে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব হন আইরিন খান। ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন। অ্যামনেস্টির ইতিহাসে তিনি প্রথম নারী মহাসচিব। একই সঙ্গে এশিয়া থেকে আসা প্রথম ব্যক্তি এবং প্রথম মুসলিম হিসেবে সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন তিনি।
অ্যামনেস্টিতে দায়িত্ব পালনকালে মানবাধিকার আলোচনার পরিধি আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেন আইরিন খান। রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার, নির্যাতন, বেআইনি আটক এবং সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার এবং নারীর অধিকার নিয়েও কাজ করেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে নারীদের ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধে অ্যামনেস্টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি বড় প্রচারণা শুরু করে।
অ্যামনেস্টির দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর কর্মজীবন থেমে থাকেনি। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সালফোর্ডের চ্যান্সেলর ছিলেন তিনি। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ল অর্গানাইজেশনের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিষ্ঠানটি আইনের শাসন ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে।
বাংলাদেশের সঙ্গেও পেশাগত যোগাযোগ বজায় রেখেছেন আইরিন খান। ২০১০ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর হিসেবে কাজ করেন তিনি। মানবাধিকার, গণতন্ত্র, লিঙ্গসমতা ও স্বাধীন গণমাধ্যম নিয়ে লেখালেখিও করেছেন।
২০২০ সালে তাঁর কর্মজীবনে যুক্ত হয় জাতিসংঘের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ওই বছরের ১ আগস্ট তিনি মতামত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষা ও প্রসারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। এই ম্যান্ডেট প্রতিষ্ঠার পর তিনিই প্রথম নারী হিসেবে দায়িত্বটি পালন করেন। ডিজিটাল যুগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ ছিল তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
মানবাধিকার ও শান্তিতে অবদানের জন্য ২০০৬ সালে আইরিন খান সিডনি পিস প্রাইজ পান। তাঁর লেখা The Unheard Truth: Poverty and Human Rights বইয়ে দারিদ্র্য ও মানবাধিকারের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। বইটি বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।
- এমএম/এসজাবা