গ্রেপ্তারের পরদিনই জামিনে আ.লীগ নেতা, ওসির বিরুদ্ধে দুই মামলা আড়ালের অভিযোগ
বিদ্যুৎ আদালতের একটি মামলার ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করা হয় বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রংপুর মহানগরের এক নেতাকে। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করা হলে পেয়ে যান জামিন।
তবে অভিযোগ উঠেছে, ওই নেতার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে আরও দুটি মামলা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা আছে। আর সেসব তথ্য আদালতের কাছে গোপন রেখেছেন রংপুর মহানগর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের।
গ্রেপ্তার হওয়ার পরদিনই জামিন পাওয়া আসামির নাম রফিকুল ইসলাম দুলাল। তিনি রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।
বিভিন্ন সূত্র জানায়, গত ২২ সেপ্টেম্বর বিকেলে নগরীর নিসবেতগঞ্জ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে মহানগর কোতোয়ালি থানা পুলিশ। বিদ্যুৎ আদালতের একটি মামলার ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে এই গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গ্রেপ্তারের পরদিন তাকে আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে জামিন শুনানি শেষে তিনি জামিন পান। এরপর ফের আত্মগোপনে চলে গেছেন।
পুলিশ ও পৃথক মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, জুলাই আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রংপুর নগরীতে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় দুটি পৃথক মামলা দায়ের হয়, যার উভয়টিতেই আওয়ামী লীগ নেতা রফিকুল ইসলাম দুলাল এজাহারভুক্ত আসামি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ১৪ মার্চ নগরীর কেরানীপাড়ার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বাপ্পি বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় দুলাল এজাহারভুক্ত ৪৪ নম্বর আসামি। এজাহারে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই দুপুরে নগরীর সুপার মার্কেটের সামনের সড়কে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে হামলা ও গুলিবর্ষণ করা হয়।
অপর মামলাটি দায়ের হয় গত বছরের ৯ মে। নগরীর মূলাটোল এলাকার বাসিন্দা রমজান আলী বাদী হয়ে এই মামলা করেন, যেখানে দুলাল এজাহারভুক্ত ১২৯ নম্বর আসামি। এই মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকেলে নগরীর কৈলাশরঞ্জন হাই স্কুল মোড় সংলগ্ন এলাকায় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণ করা হয়।
এর বাইরে চলতি বছরের ২১ আগস্ট নগরীর সিওবাজার কেল্লাবন্দ এলাকায় এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগ ওঠে। পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে যান বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা। পরে ২৮ আগস্ট কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মজিবর রহমান বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে দুলাল এজাহারভুক্ত ৩৩ নম্বর আসামি।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তার হয়েও মাত্র একদিনের মধ্যে জামিন এবং দুলালের ফের আত্মগোপনে যাওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যুবদল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতারা। তারা এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জাতীয় ছাত্রশক্তির রংপুর মহানগর কমিটির আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহম্মদ ইমতি এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘জুলাইয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর যারা নৃশংস হামলা চালিয়েছে, তাদের একজন আওয়ামী লীগ নেতা দুলালকে বিচারের বাইরে রাখা বা লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে যাওয়ার একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশসহ যারাই জড়িত, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাই।’
রংপুর জেলা যুবদলের সভাপতি নাজমুল আলম নাজু বলেন, ‘গত ১৭ বছর আমাদের মিছিল শুরু হওয়ার আগেই পুলিশ সেখানে পৌঁছে যেত। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের আসামি একজন আওয়ামী লীগ নেতা এত দ্রুত সময়ের মধ্যে কীভাবে জামিন পেয়ে গেল, সেটাই এখন প্রশ্ন।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম নাজমুল কাদের বলেন, ‘ওই আসামিকে গ্রেপ্তারের পর সিডিএমএসে তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলার তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই বিদ্যুৎ আদালতের ওই মামলাতেই চালান দেওয়া হয়েছে। মামলা গোপনের অভিযোগ সত্য নয়।’
এদিকে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মহানগর পুলিশ। গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তীকে প্রধান করে তিন সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী কালবেলাকে বলেন, ‘তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কমিটির কাছ থেকে প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। আজ (রোববার) থেকে কমিটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে, আগামী মঙ্গলবার শেষ দিন। তদন্ত শেষে কমিটি এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেবে।’
- এমএম/এসজাবা