সাতক্ষীরায় ভুয়া পুলিশকে আটক করল আসল পুলিশ
সাতক্ষীরার সদর উপজেলায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে এক নারী ও তার স্বজনদের মোটরসাইকেল থামিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় লোকজন শেখ নাজির হোসেন (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছেন। তার কাছ থেকে একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ভালুকা চাঁদপুর ছাত্তারের মিল মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আটক নাজির হোসেন সাতক্ষীরা পৌরসভার কুখরালী মাঝেরপাড়া এলাকার মৃত শেখ আব্দুল খালেকের ছেলে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দুটি মোটরসাইকেলে চার ব্যক্তি ওই নারী ও তার স্বজনদের পথরোধ করেন। তারা নিজেদের ডিবি পুলিশের সদস্য পরিচয় দেন। একপর্যায়ে সঙ্গে থাকা টাকা নেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের আচরণ নিয়ে সন্দেহ হয়। স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে চারজনের মধ্যে তিনজন পালিয়ে যান। পরে নাজির হোসেনকে একটি মোটরসাইকেলসহ আটক করা হয়।
ভুক্তভোগী মোসলেমা খাতুন বলেন, তিনি ও তার স্বামী আনারুল ইসলাম লক্ষ্মীদাড়ী এলাকা থেকে টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিলেন। পথে চারজন তাদের অনুসরণ করে। পরে নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাদের থামানো হয়। এ সময় তাদের সামনে হ্যান্ডক্যাপ দেখানো হয়। পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে পারেননি। একপর্যায়ে একজন তার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার চেষ্টা করেন।
মোসলেমা খাতুনের দাবি, তার কাছে থাকা টাকার একটি অংশ নেওয়া হয়েছিল। তবে স্থানীয় লোকজন জড়ো হয়ে যাওয়ায় পুরো টাকা নিতে পারেনি। তার মতে, অভিযুক্তদের কারও কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। তবে একজনের হাতে লাঠিসদৃশ বস্তু ও হ্যান্ডক্যাপ ছিল।
ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন আটক নাজির হোসেনকে মারধর করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরে খবর পেয়ে ব্রহ্মরাজপুর পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে হেফাজতে নেন। পরে তাকে মোটরসাইকেলসহ সাতক্ষীরা সদর থানায় হস্তান্তর করা হয়।
ব্রহ্মরাজপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) হাবিবুর রহমান ঘটনাস্থলে গিয়ে নাজির হোসেনকে হেফাজতে নেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটক ব্যক্তির ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির নম্বর সাতক্ষীরা-ল ১২-৮৭২২। প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেলটির মালিকের নাম তানভীর বলে জানা গেলেও তার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুর রহমান বলেন, ঘটনাস্থল থেকে আটক ব্যক্তিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীর অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা ও পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি গোয়েন্দা সূত্র দাবি করেছে, ঘটনাটি শুধু টাকা ছিনতাইয়ের চেষ্টা নয়; এর সঙ্গে সোনা ছিনতাইয়ের বিষয়ও থাকতে পারে। তবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ওই সূত্রের দাবি, একটি চক্রের কয়েকজন সদস্য এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন বলে সূত্রটি দাবি করেছে। তবে তাদের পরিচয় বা এ ঘটনায় সম্পৃক্ততার বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্রটি আরও দাবি করেছে, ভুক্তভোগীরা টাকার কথা বললেও প্রকৃতপক্ষে সোনার বার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। সোনা অবৈধ হওয়ায় ভুক্তভোগীরা ঘটনাটিকে টাকা ছিনতাই হিসেবে উপস্থাপন করছেন, এমন দাবি করেছে সূত্রটি। তবে এই দাবির পক্ষে স্বাধীন কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ওই সূত্রের দাবি, একটি চক্রের কয়েকজন সদস্য ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তাদের মধ্যে কয়েজন পুলিশ সদস্যও রয়েছে। তারা সাতক্ষীরার পুলিশ সুপারের বাংলোর পেছনের এলাকায় আড্ডাদেয় ও সেখান থেকে বিভিন্ন এলাকায় মুভমেন্ট করে। যেটি জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা অবগত রয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সম্প্রতি সেনা, পুলিশের কাছে অস্ত্রসহ আটকও হয়েছেন। পরে জামিনে রয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওই সূত্রের এসব দাবিও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সোনা ছিনতাই বা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরায় ৫৬ বোতল কোরেক্স সিরাপসহ দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তারা হলেন কনস্টেবল মোস্তাইন বিল্লাহ ও কনস্টেবল নাজমুল ইসলাম।
পুলিশের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সাতক্ষীরা বাইপাস সড়ক এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৫৬ বোতল কোরেক্স সিরাপ উদ্ধার করা হয়েছিল।
তবে ওই দুই পুলিশ সদস্যের সঙ্গে বর্তমান ছিনতাইয়ের অভিযোগে আটক শেখ নাজির হোসেনের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
- এমএম/এসজাবা