ইন্ডিয়া টুডের বিশ্লেষণ
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। সম্প্রতি দল দুটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে, যেখানে ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ইন্ডিয়া টুডে’র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে এই নির্বাচন দিল্লির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। উভয় দলের নির্বাচনী ইশতেহারে ভারত এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি কী অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে তা নিয়ে গুরুত্বসহকারে এই তুলনামূলক বিশ্লেষণটি তুলে ধরেছে ভারতীয় মিডিয়াটি।
এতে বলা হয়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রথম এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। ভারতের জন্য এই নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের টানাপোড়েন বর্তমানে চরমে। ভারতবিরোধী মনোভাব এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার আশঙ্কার মধ্যে তারেক রহমানের বিএনপি ও জামায়াতের ইশতেহার দিল্লির কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
গত এক দশকে ভারত সব শক্তি আওয়ামী লীগের ওপর ব্যয় করেছিল। শেখ হাসিনা বরাবরই পাকিস্তানের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে এবং চীনের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের মুখে হাসিনা দেশ ছাড়ার পর দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। ইউনূস সরকারের অধীনে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে ঝালাই করা হচ্ছে এবং অভিযোগ উঠেছে যে, কট্টরপন্থী ইসলামি গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
ভারতের বিষয়ে বিএনপি কী বলেছে?
খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে ভারত এখন একটি তুলনামূলক ‘উদার ও গণতান্ত্রিক’ বিকল্প হিসেবে দেখছে, যদিও ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খুব একটা মসৃণ ছিল না।
শুক্রবার বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার উন্মোচনকালে তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি ব্যবহার করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, বাংলাদেশ অন্যান্য দেশকে বন্ধু হিসেবে দেখবে, ‘প্রভু’ হিসেবে নয়। তিনি বলেন: “বাংলাদেশ অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং নিজের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও কারো হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না।”
এটি নয়াদিল্লির জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এর আগে কিছু বাংলাদেশি নেতার বক্তব্যে ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর (চিকেন’স নেক) নিয়ে উস্কানিমূলক ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, তার দল ভারত বা পাকিস্তান—কারো প্রতিই একতরফা ঝুঁকবে না। তার বিখ্যাত স্লোগান ছিল: “দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ।”
জামায়াতের ইশতেহারে বলা হয়েছে
তারেক রহমান ভারতের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও, জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহারে ভারতের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক’ সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে। মজার বিষয় হলো, দলটির সভাপতি শফিকুর রহমানের প্রকাশিত ইশতেহারে পাকিস্তানের কোনো উল্লেখ ছিল না।
ইশতেহারে বলা হয়, “পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও থাইল্যান্ডের সাথে শান্তিপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে।”
জামায়াতের এই অবস্থানকে তাদের আগের ভারতবিরোধী কঠোর অবস্থানের বিপরীতে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে জামায়াতকে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মনে করা হলেও এবার তারা ভারতসহ যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, জাপান ও কানাডার সঙ্গে ‘গঠনমূলক সম্পর্ক’ গড়ার অঙ্গীকার করেছে।
যদিও জামায়াতের ইশতেহারে পাকিস্তানের কোনও উল্লেখ নেই, তবুও দলটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলির সাথে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, যুক্তরাজ্য এবং কানাডার সাথে “গঠনমূলক সম্পর্ক” গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে।
জনমত জরিপগুলো একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে অধিকাংশ জরিপই তারেক রহমানের বিএনপিকে কিছুটা এগিয়ে রাখছে। তবে জামায়াতে ইসলামীও খুব বেশি পিছিয়ে নেই; বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাঁচটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় তাদের জনসমর্থনকে আরও চাঙ্গা করে তুলেছে।
হিন্দু ও সংখ্যালঘুদের নিয়ে কী বলা হয়েছে?
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে। ‘বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ’-এর মতে, কেবল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসেই ৫১টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
হিন্দুদের নিরাপত্তার বিষয়ে জামায়াত অনেকাংশেই নীরব। তাদের ইশতেহারে কেবল “ধর্মীয় ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব” নিশ্চিত করার অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে দলটি শাসনব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের কথা বলেছে।
অন্যদিকে বিএনপি হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পদ এবং উপাসনালয়ের নিরাপত্তার জন্য কঠোর আইনি সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাদের ইশতেহারে বলা হয়েছে:
“ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। কোনো বাধা ছাড়াই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব পালনের অধিকার নিশ্চিত করা হবে।”
এছাড়া তারেক রহমানের ইশতেহারে নারী ক্ষমতায়ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যু এবং স্নাতকোত্তর পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি ।
ভারতের জন্য ঢাকা কেবল একটি প্রতিবেশী দেশ নয়, বরং সীমান্ত নিরাপত্তা এবং এই অঞ্চলে চীন ও পাকিস্তানের প্রভাব মোকাবিলায় এক কৌশলগত অংশীদার। তাই ১২ ফেব্রুয়ারির লড়াইয়ের ফলাফল দিল্লির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
##





