রাজধানীতে চাঁদাবাজ নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। এরই মধ্যে রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় শীর্ষ চার শতাধিক চাঁদাবাজের তালিকাও প্রায় প্রস্তুত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, তালিকা ধরে চলতি সংসদ অধিবেশন শেষে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হবে। অভিযানের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা এই তালিকায় উঠে এসেছে রাজধানীর অপরাধজগতের চিত্র। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানার মধ্যে অন্তত ১০টি থানায় চাঁদাবাজদের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা এলাকা। এ ছাড়া মোহাম্মদপুর, কাফরুল, মিরপুর ও পল্লবী এলাকাকে চাঁদাবাজির ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, এবারের তালিকাটি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিকতর নির্ভুল ও তথ্যসমৃদ্ধ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বিশেষ নির্দেশনায় অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) এবং পুলিশের ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স ডিভিশন (আইএডি) একযোগে তথ্য সংগ্রহের কাজ করেছে। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, ‘চাঁদাবাজের তালিকার কাজ এখনো চলছে। গোয়েন্দা বিভাগ কাজটি করছে।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবিপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাঁদাবাজের তালিকা কম্পাইল করা হচ্ছে।
গোয়েন্দারা কেবল বর্তমান অভিযোগই নয়, বরং বিগত কয়েক বছরের চাঁদাবাজির মামলা, ভুক্তভোগীদের গোপন জবানবন্দি এবং প্রযুক্তির সহায়তায় আর্থিক লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তালিকাটি বর্তমানে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে এবং শিগগিরই তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। মন্ত্রণালয় থেকে ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়া মাত্রই মাঠ পর্যায়ে শুরু হবে সমন্বিত অভিযান।
জানা গেছে, রাজধানীর চাঁদাবাজি মূলত পাঁচটি সুনির্দিষ্ট খাতে বিভক্ত। এই খাতগুলো কেন্দ্র করেই ৪০০ জনের তালিকাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবহন খাত : বাস টার্মিনাল, টেম্পো ও লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন চাঁদা আদায়; ফুটপাত ও হকার : রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকার ফুটপাতগুলো দখল করে হকারদের কাছ থেকে দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায়; এলাকাভিত্তিক বাজার : কাঁচাবাজার ও নিত্যপণ্যের পাইকারি বাজারে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়; অটোরিকশা ও অবৈধ ইজি বাইক : অলিগলিতে চলাচলকারী অবৈধ যান থেকে টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে চাঁদাবাজি। অস্ত্রধারী ও পেশাদার সন্ত্রাসী : বড় বড় কনস্ট্রাকশন সাইট বা আবাসন প্রকল্প থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদাবাজি।
এছাড়া রাজধানীর বৃহত্তম পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারকে চাঁদাবাজির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, কারওয়ান বাজারকে ঘিরে অন্তত আটটি সশস্ত্র অপরাধীচক্র সক্রিয়। তারা ব্যবসায়ী ও ট্রাকচালকদের কাছ থেকে প্রকাশ্যেই লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। গত ৭ জানুয়ারি তেজগাঁও এলাকায় রাজনৈতিক নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনার মূলে ছিল কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার পরিবর্তনের পর অনেক ক্ষেত্রে শুধু চাঁদাবাজদের মুখ পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু জুলুম কমেনি।
পুরোদমে অভিযান শুরুর আগেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তৎপরতা শুরু করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। সম্প্রতি রাজধানীর শাহআলী থানার গড়ান চটবাড়ী এলাকায় র্যাব এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে তিন শীর্ষ চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—ফাইজুর রহমান মুক্তি ওরফে ডন মুক্তি, শাকির আহম্মেদ ওরফে হকি সুমন এবং গোলাম মোস্তাফা কামাল ওরফে শ্যুটার বাপ্পি। তাঁদের কাছ থেকে অবৈধ পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করা হয়। র্যাব জানায়, মিরপুর ও আশপাশের এলাকায় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছিলেন। চাঁদাবাজির তালিকায় থাকা অন্যদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।
নতুন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই পুলিশ কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলেছেন, ‘চাঁদাবাজির সঙ্গে পুলিশের কোনো পর্যায়ের সদস্যের যোগসাজশ পাওয়া গেলে শুধু বিভাগীয় শাস্তি নয়, সরাসরি ফৌজদারি অপরাধে তাঁদের বিচার করা হবে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, থানায় চাঁদাবাজির অভিযোগ এলে তা গ্রহণে কোনো গড়িমসি বরদাশত করা হবে না।’
এদিকে অভিযান হবে, চাঁদাবাজও গ্রেপ্তার হবে কিন্তু তাদের শাস্তি হবে কি না সে নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না কেউ। চাঁদাবাজি দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও আইনি মারপ্যাঁচে অনেক সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৮৫ ধারা অনুযায়ী চাঁদাবাজির শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর হলেও সাক্ষী ও প্রমাণের অভাবে বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে থাকে। অনেক সময় ভুক্তভোগীরা ভয়ে আদালতে সাক্ষ্য দিতে চান না। ফলে প্রমাণ না পাওয়ায় শাস্তি হয় না তাদের।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এসব চাঁদাবাজের বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর প্রয়োগ এবং সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর বিধানগুলো কঠোরভাবে কার্যকর করলে চাঁদাবাজি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশেষ জজ আদালত-৩-এর পাবলিক প্রসিকিউটর মো. জামাল উদ্দিন খন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাঁদাবাজির সঙ্গে যারা জড়িত তারা সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারা মাধ্যম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করে। নেপথ্যে থেকে তারা কলকাঠি নাড়ে। গত ১৭ বছরে দেখা গেছে, এই চাঁদাবাজদের সঙ্গেই পুলিশের সখ্য। ফলে কেউ চাঁদাবাজদের হাতে মারধরের শিকার হলে থানায় মামলা করেও বিচার পান না। সাক্ষীরা ভয়ে সাক্ষ্য দিতে আসেন না। চাঁদাবাজি প্রমাণ করা কঠিন হওয়ায় অপরাধীরা খালাস পেয়ে যায়।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শুধু তালিকা করে চাঁদাবাজ ধরলে হবে না। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ মামলা দিতে হবে এবং চাঁদাবাজদের সহযোগী হিসেবে সন্দেহভাজন পুলিশকে দূরে রাখতে হবে। তা না হলে এই সমস্যার সমাধান কোনো দিনও হবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘রাজধানীকে চাঁদাবাজমুক্ত করার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সরকারের জন্য একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা। পেছনে থাকা গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হলেই কেবল সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে।’





