মোংলা বন্দর: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ, পশুর নদীর ঐতিহাসিক বাধা নিরসন ও বৈশ্বিক মডেল অনুসরণে টেকসই ভবিষ্যৎ
১. ভূমিকা ও প্রস্তাবনা
বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিতে সামুদ্রিক ও নদী বন্দরসমূহের ভূমিকা অপরিসীম। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ভৌগোলিক পটভূমিতে অবস্থিত মোংলা বন্দর কেবল একটি কৌশলগত বাণিজ্যিক অবকাঠামো নয়, এটি সমগ্র জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনীতির রূপান্তরকামী চালিকাশক্তি। পশুর নদীর তীর ঘেঁষে সুন্দরবনের সংলগ্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা এই বন্দরটি দীর্ঘ সাত দশকের বেশি সময় ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন, কৃষি পণ্যের বিপণন এবং আমদানিকৃত কাঁচামাল সরবরাহে প্রধান গেটওয়ে হিসেবে কাজ করে আসছে।
তবে পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্যিক বাস্তবতা, মাদার ভেসেল (বিশালাকার জাহাজ) এর আধিক্য, আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস চেইনের দ্রুত পরিবর্তন এবং মেগা-আঞ্চলিক বাণিজ্য করিডোরসমূহের আত্মপ্রকাশের ফলে মোংলা বন্দরকে ঐতিহ্যগত কার্যপদ্ধতি থেকে বের করে একটি সর্বাধুনিক, স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তি-নির্ভর বাণিজ্যিক মেগা-হাবে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে ভারতের সেভেন সিস্টার্স খ্যাত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহ, নেপাল ও ভূটানের মতো ল্যান্ডলকড বা ভূ-বেষ্টিত রাষ্ট্রসমূহের সাথে ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট বাণিজ্য প্রসারে মোংলা বন্দরের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২. মোংলা বন্দরের ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান ও কৌশলগত অর্থনৈতিক তাৎপর্য:
১৯৫০ সালের ১ ডিসেম্বর খুলনা জেলার চ্যালা এলাকায় চালনা এনকারেজ নামে পশুর নদীতে প্রথম এই বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে পশুর নদী ও মোংলা নালার সঙ্গমস্থলে মোংলায় বন্দরটি স্থানান্তরিত হয়। খুলনা শহর থেকে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূল থেকে প্রায় ১৩১ কিলোমিটার উজানে পশুর নদীর পূর্ব তীরে মোংলা বন্দরের অবস্থান।
মোংলা বন্দরের কৌশলগত গুরুত্বের প্রধান ভিত্তিগুলো হলো:
১. প্রাকৃতিক সুরক্ষা: বিশ্বঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রাকৃতির ঢাল এই বন্দরকে প্রাকৃতির দুর্যোগ, সাইক্লোন ও জলোচ্ছাস থেকে সুরক্ষা দেয়।
২. বিশাল পশ্চাৎভূমি (Hinterland): খুলনা, বরিশাল, ঢাকা এবং বৃহত্তর রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অর্থনীতি সরাসরি মোংলা বন্দরের সাথে যুক্ত। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ঢাকা থেকে মোংলা বন্দরের দূরত্ব চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।
৩. আঞ্চলিক ট্রানজিট পয়েন্ট: ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যসমূহ (আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ইত্যাদি) এবং নেপাল ও ভূটানের জন্য মোংলা বন্দরটি সবচেয়ে নিকটবর্তী ও সাশ্রয়ী সমুদ্র বন্দর।
৪. শিল্প অঞ্চলের ভৌগোলিক সুবিধা: মংলা ইপিজেড, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি খালাসে মোংলা বন্দর মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।
৩.নতুন নেতৃত্ব, প্রশাসনিক পেশাদারিত্ব ও দক্ষ নদী ব্যবস্থাপনা
একটি আন্তর্জাতিক মানের বন্দর পরিচালনার জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় নীতিগত সিদ্ধান্ত, দক্ষ প্রশাসন এবং আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনার সমন্বয়। বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন মাননীয় মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা।
নৌ পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এর দূরদর্শী দিকনির্দেশনা এবং মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা এর নদী ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত ব্যাপক পূর্ব অভিজ্ঞতা বন্দরটির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মতো অত্যন্ত অনুশাসিত, দক্ষ ও পেশাদার বাহিনীর সদস্য হিসেবে রিয়ার এডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা এর সামরিক ও কারিগরি অভিজ্ঞতা মোংলা বন্দরের কার্যক্রমে এক নতুন গতির সঞ্চার করেছে।
নৌবাহিনীর কৌশলগত দক্ষতা মোংলা বন্দরে যেভাবে ভূমিকা রাখছে:
অনুশাসন ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ: প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা।
সুনির্দিষ্ট হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ: পশুর নদীর গতিপথ, পলি প্রবাহ এবং চ্যানেল মনিটরিংয়ে নৌবাহিনীর কারিগরি জ্ঞান প্রয়োগ।
নিরাপত্তা ও সার্ভেইল্যান্স: বন্দরের আন্তর্জাতিক মান (ISPS Code) সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং চোরাচালান প্রতিরোধ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় দ্রুততম সময়ে বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক করা।
৪.সমন্বিত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক: সড়ক, রেলপথ ও নৌপরিবহন ব্যবস্থা
মোংলা বন্দরের কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি করতে রাজধানী ঢাকা এবং সারাদেশের সাথে ত্রিমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
ক. সড়ক অবকাঠামো ও দ্রুত সংস্কার:
মোংলা থেকে খুলনা, যশোর হয়ে ঢাকা এবং উত্তরবঙ্গগামী জাতীয় মহাসড়কগুলোর অবস্থা দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। মোংলা বন্দরের অভ্যন্তরীণ বাইপাস সড়ক এবং হেভি-ডিউটি কন্টেইনার টার্মিনাল কানেক্টিভিটি রোডগুলোকে স্থায়ী ও টেকসই সুদৃঢ়করণ প্রযুক্তি দিয়ে সংস্কার করতে হবে।
খ. ঐতিহাসিক খুলনা-মোংলা রেলপথের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার:
খুলনা থেকে মোংলা পর্যন্ত সদ্য নির্মিত নতুন রেলপথটি মোংলা বন্দরের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক সংযোজন। এই রেলপথের মাধ্যমে এখন সরাসরি ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের সাথে কন্টেইনার ট্রেন পরিচালনা সম্ভব। এর ফলে সড়ক পথের ওপর চাপ কমবে এবং পণ্য পরিবহন খরচ প্রায় ৩০-৪০% হ্রাস পাবে।
গ. অভ্যন্তরীণ নৌপথ উন্নয়ন:
পশুর নদী থেকে বের হয়ে মোংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেল এবং ঢাকাগামী অভ্যন্তরীণ নৌপথগুলোকে নিয়মিত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ড্রাফট বজায় রাখতে হবে। নৌপথে বালক কার্গো ও কন্টেইনার লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন দ্রুত ও ব্যয়সংকোচনকারী।
৫.এয়ারপোর্টের আদলে আধুনিক নেভিগেশনাল প্রযুক্তি ও অটোমেশন
আধুনিক বন্দর মানে কেবল জেটি ও ক্রেন নয়; আধুনিক বন্দর মানে হলো উন্নত ডিজিটাল নেভিগেশন ও আইসিটি অবকাঠামো। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে যেভাবে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (ATC) সিস্টেমের মাধ্যমে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিমান ওঠানামা পরিচালনা করা হয়, মোংলা বন্দরেও ঠিক একই আদলে আধুনিক নেভিগেশন সুবিধা স্থাপন করতে হবে।
বাস্তবায়নযোগ্য প্রযুক্তিগত পদক্ষেপসমূহ:
১. জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা তথ্য ব্যবস্থা (VTMIS): নদীর প্রবেশমুখ থেকে জেটি পর্যন্ত প্রতিটি জাহাজের অবস্থান, গতি ও ড্রাফট রিয়েল-টাইমে মনিটর করা।
২. অটোমেটেড পাইলটেজ ও ডিজিটাল বয়া সিস্টেম: রাত কিংবা ঘন কুয়াশাতেও পশুর নদীতে নিরাপদ জাহাজ চলাচলের জন্য সেলফ-লাইটিং ডিজিটাল বয়া এবং জিপিএস ট্র্যাকিং সুবিধা চালু করা।
৩. পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম (PCS): শিপিং এজেন্ট, কাস্টমস, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে কাগজবিহীন একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিশ্চিত করা।
৬.আকরাম পয়েন্টে ডিপ সী পোর্ট ও পশুর নদী চ্যানেলের কৌশলগত গুরুত্ব:
পশুর নদীর ড্রাফট সীমাবদ্ধতার কারণে ৮.৫ মিটারের বেশি ড্রাফটের আন্তর্জাতিক মাদার ভেসেলগুলো মোংলা জেটিতে সরাসরি ভিড়তে পারে না। এই সমস্যার স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান হলো ‘আকরাম পয়েন্ট’।
আকরাম পয়েন্টের ডিপ সী পোর্ট মডেল:
বঙ্গোপসাগরের অদূরে পশুর নদীর আউটার এঙ্করেজে অবস্থিত আকরাম পয়েন্ট একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত প্রাকৃতিক চ্যানেল। এখানে পানির গভীরতা প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত থাকে। এছাড়াও কোথাও ২১ মিটার পর্যন্ত ড্রাফট পাওয়া যায়। কিছু এলাকাকে বলা হয় সোয়াচ অফ নো গ্রাউন্ড।
আকরাম পয়েন্টকে কৌশলগত ডিপ সী পোর্ট বা আউটার এঙ্করেজ ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে গড়ে তুললে বিশালাকার কন্টেইনার জাহাজ এবং খোলা পণ্যের বড় জাহাজগুলো সেখানে অনায়াসে নোঙর করতে পারবে।
সেখান থেকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য মোংলা মূল জেটিতে বা সরাসরি দেশের অভ্যন্তরীণ নৌবন্দরে নেওয়া সম্ভব হবে। এটি মোংলা বন্দরকে অত্যন্ত সাশ্রয়ী বিকল্প গভীর সমুদ্রবন্দরের সুবিধা দেবে।
৭.পশুর নদীর নাব্য সংকট: ১৯৭১ সালের নিমজ্জিত জাহাজ, যন্ত্রাংশ ও পলল সমস্যা
বর্তমানে চায়নার একটি বিখ্যাত ড্রেজিং প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় পশুর নদীর চ্যানেলে ক্যাপিটাল ও মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে স্থানীয়ভাবে গভীর খোজখবর নিয়ে এবং ঐতিহাসিক তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, পশুর নদীর চ্যানেলে পলি জমার পেছনে একটি প্রধান কারিগরি অন্তরায় রয়েছে।
৭১-এর নিমজ্জিত জাহাজের কঙ্কাল ও কারিগরি জটিলতা:
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাক-হানাদার বাহিনীর নৌঘাটতি তৈরি করতে এবং বন্দর অচল করতে বেশ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ, কার্গো ভেসেল ও ধাতব কাঠামো পশুর নদীতে এবং মোংলা চ্যানেলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
নদীর তলদেশে রেখে যাওয়া এই ধাতব কঙ্কাল, ক্রেন ও ভারী যন্ত্রাংশগুলোর চারপাশে নদীর স্বাভাবিক স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রবহমান পলি ও বালি এই ধাতব কাঠামোর সাথে আটকে গিয়ে ক্রমান্বয়ে উঁচু পলি-চর সৃষ্টি করে। এর ফলে ড্রেজিং করার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পুনরায় তলদেশের উচ্চতা বৃদ্ধি পায়।
পূর্বে কিছু ছোটখাটো ধ্বংসাবশেষ অপসারণ করা হলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও দক্ষ ডুবুরি দলের অভাবে সিংহভাগ নিমজ্জিত অবকাঠামো অপসারণ করা সম্ভব হয়নি।
স্থায়ী সমাধানের প্রস্তাবনা:
আধুনিক রোবোটিক স্স্ক্যানার, হেভি-লিফট ক্রেন ভেসেল এবং বিশেষ ডুবুরি ও স্যালভেজ টিম ব্যবহার করে নদীগর্ভ থেকে ১৯৭১ সালের সকল নিমজ্জিত মেটাল ও ধ্বংসাবশেষ সম্পূর্ণরূপে উত্তোলন করতে হবে। এটি করা সম্ভব হলে পশুর নদীতে পলি জমার হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাবে এবং ড্রেজিংয়ের স্থায়ী সুফল মিলবে।
৮.বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত: বিশ্বের সফল রিভারাইন ও এস্টুয়ারিন পোর্টসমূহের ধারাবাহিক চিত্র
বিশ্বের বহু উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ নদী বন্দর ও মোহনার বন্দরগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অর্থনৈতিক পাওয়ারহাউসে পরিণত করেছে। মোংলা বন্দরের জন্য এসব বৈশ্বিক মডেল অনুসরণের সুযোগ রয়েছে:
১. জার্মানির হামবুর্গ ও ডুইসবার্গ বন্দর:
এলবে নদীর তীরে অবস্থিত হামবুর্গ বন্দর জার্মানির সর্ববৃহৎ বন্দর, যা সমুদ্র থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত। তারা নিয়মিত চ্যানেল ড্রেজিং এবং অত্যন্ত আধুনিক রাইন-এলবে রিভারাইন নেটওয়ার্ক দিয়ে পুরো ইউরোপের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। ডুইসবার্গ বিশ্বের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ রিভার পোর্ট যা চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সাথে যুক্ত।
২. নেদারল্যান্ডসের রোটারডাম বন্দর:
রাইন ও মিউজ নদীর মোহনায় অবস্থিত রোটারডাম বন্দর বিশ্বের অন্যতম স্বয়ংক্রিয় বন্দর। সেখানে কৃত্রিম পলি ব্যবস্থাপনা এবং ‘স্মার্ট পলি ড্রেজিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে চ্যানেল সর্বদা উন্মুক্ত রাখা হয়।
৩. চীনের সাংহাই ও নানজিং বন্দর:
চীনের ইয়াংজি নদীর অববাহিকায় অবস্থিত সাংহাই এবং নানজিং বন্দর বিশ্বের অন্যতম সফল রিভারাইন পোর্ট। নদী তলদেশের গতিপথ পরিবর্তন এবং পলি জমার কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত করে তারা নিয়মিত মেগা-শিপ চলাচলের উপযোগী করে রেখেছে।
৯.বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে মোংলা বন্দরের বহুমুখী ভূমিকার রূপরেখা
একটি আধুনিক নদী বন্দর কীভাবে দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে পারে, মোংলা বন্দর তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে:
আঞ্চলিক জিডিপি বৃদ্ধি: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলায় শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরি।
রাজস্ব আয় বহুগুণ বৃদ্ধি: ট্রানজিট ফি, পোর্ট ডিউজ, কাস্টমস ডিউটি এবং লজিস্টিকস চার্জ থেকে সরকারের বিপুল রাজস্ব সংগ্রহ।
কৃষি ও তৈরি পোশাক রপ্তানি: খুলনা ও যশোরের পাট ও হিমায়িত চিংড়ি এবং ঢাকার তৈরি পোশাক শিল্প দ্রুততম সময়ে মোংলা বন্দর দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা।
নীল অর্থনীতি (Blue Economy) সমৃদ্ধকরণ: গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ, সামুদ্রিক গবেষণা এবং এনার্জি হাব হিসেবে মোংলাকে কাজে লাগানো।
১০. আশু করণীয়, নীতিগত সুপারিশ ও উপসংহার
মোংলা বন্দরকে একটি আন্তর্জাতিক মেগা-হাবে পরিণত করতে সরকারের উচিৎ দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও কারিগরি সমর্থন প্রদান করা।
জরুরি সুপারিশসমূহ:
১. ১৯৭১ সালের নিমজ্জিত সকল জাহাজ ও ধাতব কাঠামো অপসারণে অবিলম্বে বিশেষ জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা।
২. পশুর নদীতে চলমান চীনা ও দেশীয় ড্রেজিং কার্যক্রমে মেটাল অপসারণ গাইডলাইন যুক্ত করা।
৩. আকরাম পয়েন্টে দ্রুততম সময়ে আধুনিক আউটার ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনাল নির্মাণ করা।
৪. ঢাকা-মোংলা সড়ক, রেল ও নৌ করিডোরকে আন্তর্জাতিক মানের এক্সপ্রেস ট্রানজিট রুট হিসেবে ঘোষণা করা।
৫. প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সুন্দরবন রক্ষায় গ্রিন পোর্ট টেকনোলজি প্রয়োগ করা।
উপসংহারে বলা যায়, উপযুক্ত দিকনির্দেশনা, নৌবাহিনীর পেশাদারিত্ব, দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং বৈজ্ঞানিক নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মোংলা বন্দর কেবল বাংলাদেশের নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারে পরিণত হবে।
লেখক:
শাহ মামুনুর রহমান (তুহিন)
প্রেসিডেন্ট গ্লোবাল খুলনা
মোবাইল: +8801711903757
ইমেইল: shahmamunurrahmantuhin@gmail.com






