কৃষকদের কাছে সার সরবরাহে দীর্ঘদিনের ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে সরকার।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পৃথক ডিলার প্রথা বিলুপ্ত করে চালু হচ্ছে সমন্বিত ডিলার ব্যবস্থা। ,
নতুন নীতিমালায় ডিলার নিয়োগ, গুদাম, আর্থিক সক্ষমতা, বিক্রয়কেন্দ্র ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত যুক্ত করা হয়েছে।
তবে নতুন ব্যবস্থার বিরোধিতা করে আসা পুরোনো ডিলার ও সার ব্যবসায়ীদের একটি অংশ
এখনও সক্রিয় বলে অভিযোগ করেছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
কৃষকদের কাছে সুষ্ঠু ও নিরবচ্ছিন্নভাবে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার
ডিলার সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৫ (সংশোধিত)’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে গত রোববার
অফিস আদেশ জারি করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে স্বাক্ষর করেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব
আহমেদ ফয়সল ইমাম।
নতুন নীতিমালায় বিসিআইসি ও বিএডিসির আলাদা ডিলার প্রথা বিলুপ্ত করে একটি সমন্বিত
কাঠামো করা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সার বিতরণের জন্য
কমপক্ষে ৯ জন ডিলার থাকবে। সার চাহিদা ও কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ বিবেচনায়
প্রয়োজনে এ সংখ্যা বাড়ানো যাবে। ডিলার নিয়োগে স্থানীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
একজন ব্যক্তি একাধিক ডিলারশিপ নিতে পারবেন না।
স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য কেন্দ্রীয় পর্যায়ে
‘সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি’ থাকবে। একজন ডিলারের
অধীনে সর্বোচ্চ তিনটি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থাকবে। একটি ডিলার নিজে পরিচালনা করবেন,
অন্য দুটি পরিচালিত হবে তাঁর মনোনীত বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে। প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রেও
সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
নতুন ডিলার হতে আবেদনকারীকে কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা ব্যাংক সক্ষমতার সাম্প্রতিক
সনদ দিতে হবে। থাকতে হবে ট্রেড লাইসেন্স এবং কমপক্ষে ৫০ টন ধারণক্ষমতার নিজস্ব
বা ভাড়ায় নেওয়া গুদাম। গুদামে খাদ্যদ্রব্য, গো-খাদ্য, মাছের খাবার বা সবজির সঙ্গে সার রাখা যাবে না।
একই গুদামে সার ও বীজ সংরক্ষণও নিষিদ্ধ। নির্বাচিত ডিলারকে তিন লাখ টাকা জামানত দিতে হবে।
বিক্রয় প্রতিনিধির জামানত ৫০ হাজার টাকা। আবেদন ফি দুই হাজার এবং আনুষঙ্গিক বা
আর্নেস্টমানি ১০ হাজার টাকা।
একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি ডিলার বা বিক্রয় প্রতিনিধি হতে পারবেন না। সরকারি,
আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের
কর্মচারী এবং জনপ্রতিনিধিরাও বিক্রয় প্রতিনিধি হতে পারবেন না। ডিলারশিপ প্রতি দুই বছর
পর নবায়ন করতে হবে। সার বিতরণ, মজুত, গুদাম ও অন্যান্য শর্ত পালনের ভিত্তিতে নবায়নের সিদ্ধান্ত হবে।
নীতিমালার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয় গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর। পরে ১৩ নভেম্বর
বাস্তবায়নের প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এরপর সংশোধনের জন্য কমিটি গঠন করা হয়। ওই
কমিটি ডিলারের জামানত ও গুদামের ধারণক্ষমতাসহ কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তন আনে।
তবে নীতিমালা কার্যকর হওয়ার আগেই পুরোনো ডিলারদের একটি অংশ এর বিরোধিতা
করে কর্মসূচি পালন করে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার
অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) ব্যানারেও একটি অংশ নীতিমালা বাস্তবায়নের বিরোধিতা করছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সার মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট
তৈরির চেষ্টা করতে পারেন। সেই চক্রান্ত ঠেকাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি থাকবে।
জেলা কমিটির সভাপতি হবেন জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। কমিটিগুলো সার বিতরণ, মজুত, কৃষকের চাহিদা ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে।
কোনো এলাকায় ঘাটতি দেখা দিলে আন্তঃউপজেলা বা আন্তঃইউনিয়ন পর্যায়ে সার স্থানান্তরের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে ডিলারশিপ বাতিলসহ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
বিক্রয় প্রতিনিধির বিরুদ্ধেও অভিযোগ প্রমাণিত হলে জামানত বাজেয়াপ্ত ও নিয়োগ বাতিলের বিধান রয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সমন্বিত নীতিমালার মাধ্যমে সার ডিলার ব্যবস্থাকে
কৃষকবান্ধব করা হচ্ছে। কৃষক সরকার নির্ধারিত দামে সার পাবেন এবং সার বিক্রয়ের জন্য
ডিলারদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
এমএম/এসজাবা






