১. সূচনা ও পটভূমি: সংকট, ভূ-রাজনীতি এবং স্বৈরাচারের অস্থিতিশীলতার ছক
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন সবচেয়ে বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন হচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কেন্দ্র করে। বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানির এই তীব্র ঘাটতি কেবল জনজীবনকে ভোগান্তির মুখেই ঠেলে দেয়নি, বরং বাংলাদেশের কৃষি, ভারী শিল্প, তৈরি পোশাক খাত (RMG) এবং সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এক গভীর সংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে চরম অবহেলা, অতিমাত্রায় আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG), কয়লা ও খনিজ তেলের ওপর নির্ভরতা এবং বিগত সরকারের গৃহীত অদূরদর্শী ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ ভিত্তিক বিদ্যুৎ নীতি আজকের এ মহাবিপর্যয়ের মূল কারণ। সাবেক স্বৈরাচারী ও দলীয়করণের নীতিতে পরিচালিত প্রশাসন যেসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছিল, তার সিংহভাগই ছিল চুক্তিভিত্তিক অন্যায্য শর্তে ভরপুর। এর ওপর বর্তমান বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা পুরো ব্যবস্থাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে।
এই রূপ পরিস্থিতিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই জাতীয় সংকটকে সমাধান করার কোনো গঠনমূলক বা সহমর্মিতামূলক প্রস্তাব না দিয়ে উল্টো সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার অপচেষ্টায় মেতে উঠেছে। সরকারের সীমাবদ্ধতা ও সংকটের মূল কারণগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে সংকটকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা, ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করা এবং জনগণকে ক্ষিপ্ত করে তোলার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় সংকটময় মুহূর্তে সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষের দায়িত্ব ছিল ঐক্যবদ্ধভাবে জাতীয় কৌশল গ্রহণে সরকারকে সহযোগিতা করা। কিন্তু বিরোধী পক্ষের এই হিংসাত্মক ও সুবিধাবাদী অবস্থান প্রকারান্তরে পতিত স্বৈরাচারী শক্তির পুনঃউত্থানের পথ সুগম করছে এবং দেশে একটি গভীর অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরির পরিবেশ তৈরি করছে।
একটি গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে বর্তমান সরকারকে একদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে এ অপপ্রচারের মোকাবিলা করতে হবে, আর অন্যদিকে অতি দ্রুত বাস্তবসম্মত, বিজ্ঞানসম্মত ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া সার্বিক অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা অচল। তাই সংকট উত্তরণে সরকারের আশু, স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।
২. রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা: গণসচেতনতা ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবেলার প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা। সরকার যদি জনগণকে সংকটের মূল কারণ, অতীত সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল বকেয়া ঋণ ও ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত চিত্র সবিস্তারে ব্যাখ্যা করে, তবে বিরোধী দলগুলোর বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
শ্বেতপত্র প্রকাশ: বিগত মেয়াদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কত টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে অপচয় করা হয়েছে, কাদের সুবিধা দিতে অপ্রয়োজনীয় পাওয়ার প্ল্যান্ট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং আদানি বা অন্যান্য চুক্তি কীভাবে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে জিম্মি করেছে—তার একটি পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ ‘শ্বেতপত্র’ দ্রুত প্রকাশ করতে হবে।
নিয়মিত ও স্বচ্ছ ব্রিফিং: বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ও জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রতি সপ্তাহে বিদ্যুৎ উৎপাদন, গ্যাসের সরবরাহ, ফুয়েল আমদানি এবং লোডশেডিংয়ের আগাম সময়সূচি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
বিরোধী দলের সাথে রাজনৈতিক সংলাপ: জাতীয় সংকট মোকাবেলায় সকল রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক ডেকে সংকটের তীব্রতা ও সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরতে হবে। এতে বিরোধী দলের অহেতুক উস্কানির পথ বন্ধ হবে।
৩. পর্যায়ভিত্তিক রূপরেখা: আশু, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মতো জটিল ও বহুমাত্রিক জাতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য পর্যায়ভিত্তিক সুনির্দিষ্ট রূপরেখা অনুসরণ করা জরুরি:
৩.১. আশু বা জরুরি পদক্ষেপ (সময়সীমা: ১ থেকে ৩ মাস)
জরুরি মুহূর্তে প্রথম কাজ হবে বিদ্যুৎ গ্রিডের বিপর্যয় রোধ করা এবং স্বল্পতম সময়ে লোডশেডিংকে সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনা। এজন্য প্রথমত, জাতীয় আয় ও কর্মসংস্থান বজায় রাখতে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক (RMG), টেক্সটাইল এবং সংবেদনশীল উৎপাদনশীল শিল্পাঞ্চলে অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে আবাসিক ও বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ ব্যবহারে সময়ভিত্তিক রেশনিং পদ্ধতি কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহকারীদের বকেয়া মূল্য মেটাতে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প বা কম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করে একটি জরুরি ডলার ফান্ড গঠন করতে হবে। তৃতীয়ত, অবৈধ সংযোগ ও অনধিকৃত চার্জিং স্টেশন বন্ধে টাস্কফোর্স গঠন করে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। четверত, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও সাইনবোর্ডে নির্দিষ্ট সময়ের পর বিদ্যুৎ ব্যবহার বন্ধের মাধ্যমে অপচয় রোধ করতে হবে।
৩.২. স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ (সময়সীমা: ৩ থেকে ১২ মাস)
স্বল্পমেয়াদী মেয়াদে অন্তত ১,০০০ থেকে ১,৫০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ করা এবং দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। শিল্পকারখানা, সরকারি ভবন, বিশ্ববিদ্যালয় ও বাণিজ্যিক ভবনের অব্যবহৃত ছাদে ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতিতে সোলার প্যানেল বসানোর নীতি প্রণোদনা দিতে হবে। এছাড়া বাপেক্স ও অন্যান্য কোম্পানির অধীনে থাকা প্রায় ২০-২৫টি নিষ্ক্রিয় বা কম উৎপাদনশীল গ্যাসকূপ ওয়ার্কওভার (Workover) বা সংস্কার করে প্রতিদিন ১০০-১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব। একইসাথে বিতরণ লাইনের সিস্টেম লস কমাতে প্রি-পেইড মিটারিং দ্রুত শেষ করতে হবে।
৩.৩. মধ্যমেয়াদী পদক্ষেপ (সময়সীমা: ১ থেকে ৩ বছর)
জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা অন্তত ৩০% কমিয়ে সাশ্রয়ী বিদ্যুতের নিশ্চয়তা আনতে মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। স্থলভাগে দ্রুত অন্তত ৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের প্রকল্প সম্পন্ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একক কোনো দেশের ওপর নির্ভর না করে ভারতের মধ্য দিয়ে ত্রিদেশীয় করিডোর ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ আমদানির দ্বিপাক্ষিক চুক্তি চূড়ান্ত করতে হবে। এছাড়া উপকূলীয় এলাকায় বায়ু বিদ্যুৎ (Wind Farm) ও বড় জলাশয়ে ভাসমান সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পগুলো ত্বরান্বিত করতে হবে।
৩.৪. দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ (সময়সীমা: ৩ থেকে ১০ বছর)
দীর্ঘমেয়াদে টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জনের পথ সুগম করতে হবে। বঙ্গোপসাগরের অগভীর ও গভীর ব্লকে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি (IOC) আকর্ষণ করে বিশাল গ্যাস মজুদ অনুসন্ধান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। পাশাপাশি ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (BESS) এবং স্মার্ট ডিস্ট্রিবিউশন গ্রিড স্থাপন করতে হবে যাতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের তারতম্য সামলানো যায়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপদ পরিচালনা ও গ্রীন হাইড্রোজেন প্রযুক্তির সম্ভাব্যতা বাস্তবায়ন করা দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের অংশ।
৪. বিকল্প জ্বালানি, সোলার ও উইন্ড টারবাইন স্থাপনের ভৌগোলিক ও কৌশলগত স্থান
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে জমির অভাবকে প্রায়শই সৌর বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য শক্তির অন্যতম বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু ভৌগোলিক বিশ্লেষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে প্রচুর সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়।
৪.১. সোলার পাওয়ার (Solar PV) কোথায় ও কীভাবে স্থাপন করা সম্ভব?
শিল্পাঞ্চলের ছাদ (Rooftop Solar): গাজীপুর, সাভার, নারায়াণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রূপগঞ্জ এবং কুমিল্লা ইপিজেড-এর হাজার হাজার পোশাক ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার বিশাল ছাদ রয়েছে। এই ছাদগুলোতে মোট প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
চর ও পরিত্যক্ত অনুর্বর জমি: যমুনা, মেঘনা, পদ্মার চরাঞ্চল (যেমন: চরাঞ্চলীয় জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নোয়াখালী ও ভোলা) যেখানে ফসল উৎপাদন কম হয়, সেখানে গ্রিড-সংযুক্ত সোলার পার্ক স্থাপন করা যায়। জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে ও টেকনাফে সফল সোলার পার্কের মডেল পুরো দেশে প্রয়োগ করা সম্ভব।
ভাসমান সৌর বিদ্যুৎ (Floating Solar): বাংলাদেশের বিশাল জলাশয় যেমন—কাপ্তাই হ্রদ, চালনা, বিভিন্ন সরকারি দিঘি, হাওড় অঞ্চল এবং মাছ চাষের বড় বড় দিঘিতে ভাসমান সোলার প্যানেল বসানো যায়। কাপ্তাই হ্রদে মাত্র ১০% জলভাগে সোলার বসালে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।
রেলওয়ে ও মহাসড়কের রোডসাইড জমি: হাইওয়েগুলোর আইল্যান্ড এবং রেললাইনের দুপাশের অব্যবহৃত খাস জমিতে দীর্ঘ লাইনার সোলার প্যানেল স্থাপন করা যেতে পারে।
৪.২. উইন্ড টারবাইন (Wind Energy) স্থাপনের উপযোগী এলাকা
বাংলাদেশের দীর্ঘ ৭২৪ কিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চলে বাতাসের গতির সঠিক সদ্ব্যবহার এতদিন করা হয়নি। আধুনিক হাই-টাওয়ার (১০০-১২০ মিটার উঁচু) ও স্বল্প বাতাসে কার্যকর উইন্ড টারবাইন প্রযুক্তির মাধ্যমে নিম্নের স্থানগুলোতে বড় মাত্রায় বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব:
উপকূলীয় ও দ্বীপ অঞ্চল: কক্সবাজার (মাতারবাড়ী, মহেশখালী), পটুয়াখালী (পায়রা), বরগুনা, ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ এবং কুতুবদিয়া। ইতিমধ্যে কক্সবাজারে ৬০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র সফলতা দেখিয়েছে।
অফশোর উইন্ড ফার্ম (Offshore Wind): বঙ্গোপসাগরের অগভীর সমুদ্র এলাকায় বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ৭ থেকে ৮.৫ মিটার। সাগরের পানিতে ভাসমান বা শক্ত ভিত্তির ওপর উইন্ড টারবাইন বসিয়ে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।
৫. কারখানা, গার্মেন্টস ও শিল্প খাতের উৎপাদন সচল রাখার কৌশল
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক (RMG), টেক্সটাইল, স্টিল, সিমেন্ট ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। জ্বালানি সংকটে এই খাতগুলো বন্ধ হয়ে গেলে কোটি কোটি মানুষ বেকার হবে এবং রপ্তানি আয় ধসে পড়বে।
শিল্পাঞ্চলে আলাদা ‘Dedicated Energy Feeder’: প্রধান প্রধান শিল্প ক্লাস্টারগুলোকে আলাদা গ্রিড লাইনের মাধ্যমে অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিদ্যুৎ দিতে হবে যাতে আবাসিক লোডশেডিংয়ের প্রভাব শিল্পে না পড়ে।
ক্যাপটিভ পাওয়ারে ক্যাপাসিটি বুস্টিং ও বর্জ্য তাপ ব্যবহার (CCHP): কারখানার ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোতে বর্জ্য তাপ ব্যবহার করে ‘কম্বাইন্ড কুলিং, হিটিং অ্যান্ড পাওয়ার’ (CCHP) বা কো-জেনারেশন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা। এতে একই গ্যাস থেকে ৩৫%-৪০% অতিরিক্ত শক্তি ও বাষ্প তৈরি হয়।
সৌর বিদ্যুৎ ও নেট মিটারিং চালুর ত্বরান্বিতকরণ: কারখানার মালিকদের অতি সহজ শর্তে ও শুল্কমুক্ত সুবিধায় সোলার প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানির সুযোগ দিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিতে হবে যাতে সবুজ অর্থায়নের (Green Financing) অধীনে ন্যূনতম সুদে শিল্প-সোলার ঋণ দেওয়া হয়।
শিল্প খাতের কাজের শিফট বিন্যাস: এলাকাভিত্তিক সাপ্তাহিক ছুটির দিন ভিন্ন করা এবং রাতে কম বিদ্যুতের পিক আওয়ারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিয়ে কারখানা চালানোর যৌক্তিক শিফটিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করা।
৬. ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা/ইজিবাইক: বিদ্যুৎ অপচয় না অর্থনৈতিক বিপ্লব?
বাংলাদেশে বর্তমানে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ লাখের বেশি ৩ চাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও ভ্যান চলাচল করছে। এগুলো প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হলেও বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের সময় তাদের বিদ্যুৎ খরচ নিয়ে তীব্র আলোচনা হচ্ছে।
৬.১. অটোরিকশা গ্রিড থেকে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করে?
একটি স্ট্যান্ডার্ড ইজিবাইকে ৪ থেকে ৬টি ১২ ভোল্টের লেড-অ্যাসিড (Lead-Acid) ব্যাটারি থাকে। প্রতিদিন একটি ইজিবাইক রিচার্জ করতে প্রায় ৪ থেকে ৬ ইউনিট (kWh) বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। সে হিসাবে ৩০ লাখ ইজিবাইক প্রতিদিন গড়ে ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা (MWh) বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। পিক আওয়ারে (সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত) চার্জ দেওয়ার কারণে জাতীয় গ্রিডের ওপর প্রায় ১,৫০০ থেকে ২,০০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত চাহিদার চাপ সৃষ্টি হয়, যা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ১০-১২ শতাংশ! এর সিংহভাগ চার্জিং অনুষ্ঠিত হয় অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিক গ্যারেজে, যেখানে চুরির বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় এবং সরকার শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
৬.২. বিকল্প ব্যবস্থাপনা: অফ-গ্রিড সোলার চার্জিং ও ব্যাটারি সোয়াপিং (Battery Swapping)
অটোরিকশা বন্ধ করে দেওয়া কোনো সামাজিক সমাধান নয়, কারণ এতে লাখ লাখ পরিবার নিঃস্ব হবে। সমাধান লুকিয়ে আছে আধুনিক প্রযুক্তিতে:
সোলার নির্ভর ডে-টাইম চার্জিং স্টেশন: বাসস্ট্যান্ড, অটো স্ট্যান্ড এবং গ্রামীণ বাজারের পাশে ‘সোলার অটো চার্জিং হাব’ গড়ে তুলতে হবে। দিনের বেলায় সূর্যের আলো দিয়ে সরাসরি চার্জ দেওয়া হলে গ্রিডের ওপর শূন্য চাপ পড়বে।
ব্যাটারি সোয়াপিং স্টেশন (Battery Swapping Technology): ইজিবাইকের চালক তার ডিসচার্জড ব্যাটারি খুলে দিয়ে মাত্র ২ মিনিটে পূর্ণ চার্জকৃত ব্যাটারি নিয়ে যাবে। এই সোয়াপিং স্টেশনগুলোতে সোলার প্যানেল এবং রাতের অফ-পিক আওয়ারে (রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা, যখন বিদ্যুতের চাহিদা সর্বনিম্ন থাকে) গ্রিড থেকে সস্তায় বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ করা হবে।
লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি থেকে লিথিয়াম-আয়ন (Li-ion) ব্যাটারিতে রূপান্তর: পুরোনো লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির চার্জিং দক্ষতা মাত্র ৬০-৭০% (বাকিটা তাপ হিসেবে নষ্ট হয়)। অন্যদিকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির দক্ষতা ৯৫% এর বেশি, ওজন তিনগুণ কম এবং রিচার্জ হতে মাত্র ২ ঘণ্টা সময় নেয়। এই রূপান্তরের ফলে বিদ্যুতের সার্বিক খরচ অন্তত ৩০% কমে যাবে।
৬.৩. সোলার প্যানেলের মাধ্যমে কি ইজিবাইকের কাঙ্ক্ষিত চাহিদা মেটানো সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ, সম্পূর্ণ সম্ভব, তবে প্রযুক্তিগত নিখুঁত সমন্বয়ের মাধ্যমে।
একটি ইজিবাইকের ছাদে সরাসরি সোলার প্যানেল বসিয়ে পুরো চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়, কারণ ইজিবাইকের ছাদের ক্ষেত্রফল সর্বোচ্চ ২ থেকে ২.৫ বর্গমিটার। এতে সর্বোচ্চ ২৫০- ৩০০ ওয়াটের সোলার প্যানেল ধরে, যা দিনে ১ থেকে ১.৫ ইউনিট বিদ্যুৎ দেবে (প্রয়োজনের মাত্র ২৫%)।
তবে, বিকেন্দ্রীভূত সোলার চার্জিং স্টেশন (Off-grid Solar Hubs) এর মাধ্যমে এটি ১০০% সম্ভব। যদি প্রতিটি উপজেলায় ১০ থেকে ১৫টি করে ৫০০ কিলোওয়াটের ডেডিকেটেড সোলার চার্জিং হাব তৈরি করা হয়, তবে একটি ইজিবাইকও জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার না করে সারাদিন চলতে পারবে।
৭. আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও বিকল্প বিদ্যুৎ আমদানি: ভারতের আদানি বনাম চায়না ও অন্যান্য দেশ
ভারতের আদানি পাওয়ারের সাথে সম্পাদিত তৎকালীন বিদ্যুৎ চুক্তিটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে অন্যতম অসম ও ব্যয়বহুল চুক্তি। ঝাড়খণ্ডের গড্ডা পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ১,৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয়ের জন্য বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক বেশি দামে কয়লার মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে এবং বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে। বকেয়া বিল জমে যাওয়ার অজুহাতে বা রাজনৈতিক চাপে সরবরাহ হ্রাস বা বন্ধ করা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে।
৭.১. চীনের কাছ থেকে কি সরাসরি বিদ্যুৎ বা দ্রুত মেগা প্রজেক্ট আনা সম্ভব?
চীন ভৌগোলিকভাবে সরাসরি বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন নয়। তাই চীন থেকে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ক্যাবলের (Cross-border grid) মাধ্যমে আনা সাময়িকভাবে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণে জটিল। কিন্তু চীন অন্যভাবে আমাদের দ্রুত সমাধান দিতে পারে:
দ্রুত মেয়াদী সোলার ও এনার্জি স্টোরেজ (BESS) সরঞ্জাম সরবরাহ: চীন বিশ্বের ৯০% সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি তৈরি করে। চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় আগামী ৬ মাসের মধ্যে ১,০০০ মেগাওয়াট সোলার পার্ক এবং ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম স্থাপন করা সম্ভব।
বিদ্যমান বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি অর্থায়ন: চীনভিত্তিক এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) এবং চৈনিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বকেয়া মেটানো ও কয়লা/এলএনজি আমদানির জন্য কারেন্সি সোয়াপ (Yuan-Taka Swap) চুক্তি করা যেতে পারে। এতে ডলার সংকটের ওপর চাপ কমবে।
৭.২. নেপাল ও ভুটান: আসল সাশ্রয়ী ও স্থায়ী বিকল্প
বাংলাদেশ যদি আদানির মতো একক অন্যায্য চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, তবে ভারতের মধ্য দিয়ে ত্রিদেশীয় করিডোর ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ (Hydro-electricity) আমদানির সুযোগ সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে হবে।
খরচ ও সাশ্রয়: আদানি বা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের খরচ প্রতি ইউনিট ১৬ থেকে ২২ টাকা পর্যন্ত পড়ে। অন্যদিকে নেপালের জলবিদ্যুৎ মাত্র ৬ থেকে ৮ টাকায় আমদানি করা সম্ভব! এতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অন্তত ৫০-৬০% হ্রাস পাবে।
গ্রীন এনার্জি লক্ষ্যমাত্রা: জলবিদ্যুৎ পুরোপুরি পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য। নেপাল ও ভুটানে বর্ষাকালে হাজার হাজার মেগাওয়াট উদ্বৃত্ত জলবিদ্যুৎ থাকে যা তারা বাংলাদেশে সাশ্রয়ী মূল্যে পাঠাতে ইচ্ছুক।
৭.৩. লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (LNG) ও জ্বালানি আমদানিতে বৈচিত্র্যায়ন
স্পট মার্কেট (Spot Market) থেকে চড়া দামে এলএনজি না কিনে কাতার, ওমান, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর সাথে সরকারি পর্যায়ে (G2G) সরাসরি মেয়াদী চুক্তিতে সাশ্রয়ী দামে গ্যাস আনতে হবে।
৮. নীতিগত সুপারিশ ও রূপকল্প: একটি টেকসই বাংলাদেশের রোডম্যাপ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মতো জাতীয় সমস্যা একদিনে দূর হবে না, তবে সঠিক নেতৃত্ব, সততা ও আধুনিক বিজ্ঞানের ব্যবহার থাকলে এটিকে ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে পুরোপুরি সহনীয় ও স্থিতিশীল করা সম্ভব।
ইনডেমনিটি আইন বাতিল ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ: ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০’ (যা ইনডেমনিটি আইন নামে পরিচিত) অবিলম্বে স্থায়ীভাবে বাতিল করে বিদ্যুৎ খাতের সকল কেনাকাটা উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
বাপেক্স (BAPEX) শক্তিশালীকরণ: বিদেশী কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় অনুসন্ধান সংস্থা বাপেক্সকে পর্যাপ্ত আধুনিক ড্রিলিং রিগ ও অর্থ বরাদ্দ দিয়ে দ্রুত স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে নামাতে হবে।
সৌর শক্তির ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার: ইনভার্টার, সোলার প্যানেল, লিথিয়াম ব্যাটারি ও সোলার মাউন্টিং স্ট্রাকচারের ওপর থেকে সমস্ত আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে।
জ্বালানি অডিট (Energy Audit) বাধ্যতামূলক করা: দেশের সকল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত ‘এনার্জি অডিট’ বাধ্যতামূলক করা।
উপসংহার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কোনো দলীয় রাজনৈতিক বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি ও জনমানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা গুজবে কান না দিয়ে সরকারকে সুযোগ দিতে হবে এবং সরকারকেও চরম স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা রূখে দিয়ে যদি দেশীয় সম্পদ আহরণ, নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির বিপ্লব এবং আন্তর্জাতিক বিকল্প জ্বালানি উৎসে মনোযোগ দেওয়া যায়—তবে বাংলাদেশ এই বিপর্যয়কে সম্ভাবনায় রূপান্তর করে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে যাবে।
লেখক: প্রেসিডেন্ট গ্লোবাল খুলনা
মোবাইল: +8801711903757
ই-মেইল: shahmamunurrahmantuhin@gmail.com






