ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে হঠাৎ করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের মিছিল বের হচ্ছে। গত কয়েকদিনে বিভিন্ন এলাকায় ঝটিকা মিছিল করে দলটির পলাতক নেতাকর্মীরা। এসব মিছিলে ‘আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে’-এমন বার্তা ছাড়াও বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা গেছে। সর্বশেষ গুলশানে আওয়ামী লীগের কয়েক শত পলাতক নেতা-কর্মী মিছিল করে। এ সব মিছিলের ভিডিও করে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রশ্ন উঠেছে ঝটিকা মিছিলের আগাম খবর কী পাচ্ছে না গোয়েন্দারা? পুলিশ কেন তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতরের সাথে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় না থাকা এবং উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঠিক মনিটরিংয়ের অভাব ফুটে উঠেছে মাঠ পর্যায়ের পুলিশের মধ্যে। রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কাজ করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ঢাকার গুলশান শুধু রাজধানীর অভিজাত এলাকাই নয়- রাষ্ট্রের ক্ষমতা, কূটনীতি ও নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাসভবন, বিদেশি কূটনৈতিক মিশন এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বসবাসের কারণে এই এলাকার নিরাপত্তা সবসময়ই থাকে বিশেষ নজরদারিতে। কিন্তু সেই গুলশানেই হঠাৎ প্রকাশ্যে একটি মিছিল বের করে ফেললো কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকশো মানুষ। এ যেন ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশলে নিরাপত্তার বলয়কে চ্যালেঞ্জ করে দেওয়া হলো বার্তা।
যদিও পরে রাতভর অভিযানে আওয়ামী লীগের ৩৪ জন নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএমপির কয়েকটি থানার পুলিশ সদস্যরা ইনকিলাবকে জানিয়েছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগসহ তাদের অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে তারা সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থানা এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। এরপরও কোন থানা এলাকায় ঝটিকা মিছিল করা হলে সেই দায় কীভাবে নেবে পুলিশ সদস্যরা।
ফলে আ.লীগের ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে সিংহভাগ পুলিশ সদস্যদের মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি থানার দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের মধ্যে উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দ্রুত না পাওয়ায় অনেকটা হতাশা কাজ করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাবেক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইনকিলাবকে বলেন, ঢাকার গুলশান-বারিধারা-বনানী খুবই গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। গুলশানে প্রধানমন্ত্রী বসবাস করেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতের মতো প্রভাবশালী দেশসহ ঢাকাস্থ প্রায় সব কূটনৈতিক মিশনও এই এলাকায়। সশস্ত্রবাহিনীর গোয়েন্দা শাখা, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), গোয়েন্দা পুলিশ সবাই অ্যাকটিভ আছে। তারপরও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কীভাবে জমায়েত করতে পারলো, পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ করলো, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কেনইবা রাবার বুলেট ছুড়তে হলো এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই স্পষ্ট হবে গোয়েন্দা ব্যর্থতা না-কি অন্য কোনো কারণ নেপথ্যে আছে। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ১২ দলীয় জোট আয়োজিত ‘চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলটি হঠাৎ করে প্রকাশ্যে মিছিল করার চেষ্টা করছে। এত মানুষ কীভাবে জড়ো হলো, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তা জানত কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। পুলিশ প্রশাসন কী করছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা দেশে ও দেশের বাইরে আত্মগোপনে চলে যান। আবার কেউ কেউ জনতার রোষনলের ভয়ে দেশের বাইরে পালিয়ে যান। অনেকেই আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন। ৫ আগস্টের পর গত বছর প্রকাশ্যে সেভাবে কার্যক্রম চালাতে দেখা যায়নি দলটির নেতাকর্মীদের। কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েও তা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে আওয়ামী লীগ।
তবে, চলতি বছরের শুরু থেকে ধীরে ধীরে মিছিল শুরু করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। হঠাৎ করেই মিছিল করে আবার নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিচ্ছে তারা। সম্প্রতি বেড়েছে আওয়ামী লীগের ‘ঝটিকা মিছিল’। বিভিন্ন কৌশল ও অর্থের বিনিময়ে মাঠের শক্তি দেখানোর জন্য আওয়ামী লীগ এ ঝটিকা মিছিল করছে। মিছিল ঢাকায় হলেও এতে অংশ নেওয়া অধিকাংশ নেতাকর্মী ঢাকার বাইরের। স্থানীয় লোকজন যাতে তাদের না চিনতে পারে এবং সহজে মিছিল করে চলে যেতে পারে, সেজন্য ঢাকার বাইরের নেতাকর্মীদের ঢাকায় আনা হচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপে মিছিলের নির্দেশনা দিচ্ছেন বিদেশে পালানো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে গ্রেফতার অনেকেই পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে তাদের বিদেশ থেকে নির্দেশনা ও অর্থ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, ঝটিকা মিছিলে ঢাকার স্থানীয় নেতাকর্মীদের কম ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢাকার কয়েকজন নেতৃত্ব দিলেও অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী ঢাকার বাইরে থেকে আসছেন, যাতে তাদের সহজে শনাক্ত করা না যায়। গুলশানের ঝটিকা মিছিলে অংশ নেয়া ৩৪ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীকে এরই মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা মিছিলে অংশ নেয়াদের শনাক্ত করেছি। এদের গ্রেফতারে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চলছে। পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আইন অমান্য করে ঝটিকা মিছিল বা অন্য কোন অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত হলে তাদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা হবে।
সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে উত্তরা থেকে মিছিলের প্রস্তুতির সময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের আরো চার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বেলা সোয়া ১টার দিকে উত্তরা পশ্চিম থানার আব্দুল্লাহপুর ফ্লাইওভারের নিচে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডিতে ঝটিকা মিছিলের সময় মহিলা আওয়ামী লীগের সাত নেত্রী ও তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসের চালককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ভোরে ধানমন্ডি-২ নম্বর সড়কের স্টার কাবাব রেস্তোঁরার সামনে থেকে ২০-২৫ জন নারী একটি মিছিল বের করেন। ‘মুজিব প্রেমিক বাংলার নারীরা’ লেখা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে তারা বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে ৩ নম্বর সড়কের দিকে যান। গত ১১ আগস্ট বেলা দেড়টার দিকে মহাখালীর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউ সংলগ্ন মুক্তিযোদ্ধা গলি ও সিএম পাম্পের সামনে আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের ব্যানারে ৩০-৪০ জন জড়ো হন। তারা ঝটিকা মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন স্থানীয় জনতা একজনকে গণপিটুনি দেন। পরে তাকে মহাখালী টার্মিনাল পুলিশ ফাঁড়িতে হস্তান্তর করে।






