পানির নিচে সোলার প্যানেল বসিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সফল হয়েছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। দক্ষিণ চীন সাগরে ১০ মিটার গভীরে বিশেষভাবে তৈরি পেরোভস্কাইট সৌর প্যানেল পরীক্ষা করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ব্যাটারি চার্জ করতেও সক্ষম হয়েছেন তারা।
চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের এই সাফল্যকে পানির নিচে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে সমুদ্রের নিচে থাকা পর্যবেক্ষণ, যোগাযোগ, জলজ চাষ ও অন্যান্য সরঞ্জামে বিদ্যুৎ সরবরাহে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘জুল’-এ গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা সমুদ্রের পানির নিচে পৌঁছানো সীমিত সূর্যালোক কাজে লাগানোর জন্য ওয়াইড-ব্যান্ডগ্যাপ পেরোভস্কাইট সৌরকোষ তৈরি করেছেন। দক্ষিণ চীন সাগরে বড় আকারের সৌর প্যানেল পরীক্ষা করে দুই ঘণ্টায় ৩২৪ মিলিওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করেন তারা।
এই বিদ্যুৎ দিয়ে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চার্জ করার পাশাপাশি এলইডি বাতিও জ্বালানো হয়েছে। গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড এনার্জির ডিন ঝাং ওয়েনহুয়া। তিনি জানান, ১০ মিটার গভীরতায় পরীক্ষার আগে গবেষকরা ৫০ থেকে ১০০ মিলিওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের আশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে উৎপাদন হয়েছে ৩০০ মিলিওয়াট-ঘণ্টারও বেশি।
সমুদ্রের পানির মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো খুব দ্রুত শোষিত হয়। বিশেষ করে লাল ও অতিবেগুনি রশ্মি পানির ওপরের স্তরেই অনেকটা হারিয়ে যায়। ফলে গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো কমে আসে এবং এর বর্ণালীও পরিবর্তিত হয়।
এ কারণে প্রচলিত সিলিকন সৌরকোষ পানির নিচে খুব একটা কার্যকর নয়। নতুন পেরোভস্কাইট সৌরকোষটি পানির নিচে পৌঁছানো নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
পরীক্ষাগারে ১০ মিটার গভীরতার পানির নিচের আলো অনুকরণ করে পরীক্ষা চালানো হলে ছোট আকারের সৌরকোষটি ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশ বিদ্যুৎ রূপান্তর দক্ষতা দেখায়।
এরপর বাস্তব সমুদ্রের পানিতে দক্ষিণ চীন সাগরের ওয়েইঝো দ্বীপের কাছে বড় আকারের সৌর প্যানেল পরীক্ষা করা হয়। সেখানেও সফলভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যাটারি চার্জ করা সম্ভব হয়।
পানির নিচে দীর্ঘদিন ব্যবহারের সক্ষমতা যাচাই করতে গবেষকরা পরীক্ষাগারে ১০ মিটার গভীরতার পরিবেশ অনুকরণ করে টানা ১ হাজার ১৬০ ঘণ্টা সৌরকোষটি চালান। এতে উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মক্ষমতা হ্রাস দেখা যায়নি।
পরীক্ষার ভিত্তিতে গবেষকরা ধারণা করছেন, ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানির নিচের পরিবেশে সৌরকোষটি প্রায় ৫ দশমিক ৪৯ বছর কার্যকর থাকতে পারে।
তবে বাস্তব সমুদ্রের পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষার মাধ্যমে এই আয়ুষ্কাল এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। সমুদ্রের পানিতে ব্যবহারের উপযোগী করতে সৌরকোষের আবরণ আরও উন্নত করার প্রয়োজন রয়েছে।
এছাড়া পেরোভস্কাইট সৌরকোষে থাকা সিসা পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও জানিয়েছেন গবেষকরা।
গবেষক দল এখন ২০ থেকে ৩০ মিটার গভীরতায় সৌরকোষটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করছে। তাদের ধারণা, আরও গভীর পানিতেও প্রযুক্তিটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হতে পারে।
সফলভাবে উন্নয়ন করা গেলে সমুদ্রের নিচে থাকা বিভিন্ন যন্ত্রপাতির জন্য এটা দীর্ঘমেয়াদি ও পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের নতুন উৎস হতে পারে। বিশেষ করে সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ, স্মার্ট মেরিন সিস্টেম, জলজ চাষ এবং পানির নিচের যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রযুক্তিটির ব্যবহার সম্ভব বলে মনে করছেন গবেষকরা।
- এমএম/এসজাবা






